রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবিরা ছিলেন নববি ইলমের ধারক ও বাহক। নবীজির জীবদ্দশায় তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে তারা সরাসরি তার কাছে গিয়ে সমাধান নিতেন। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পরও বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্কলারদের এই মতপ্রকাশের ভিন্নতা আরও বৃদ্ধি পায় এবং নতুন নতুন সমস্যার মুখে প্রত্যেকে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। প্রকৃতপক্ষে, মতপার্থক্য যখন একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে, তখন তা সৌন্দর্যের রূপ নেয়; কিন্তু তা সীমালঙ্ঘন করলেই সমাজে বিপর্যয় নেমে আসে।
নবীজির সময়ে সাহাবিদের মধ্যকার মতপার্থক্যের একটি অন্যতম উদাহরণ হলো বনু কুরাইজার অভিযান। সেই অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, বনু কুরাইজায় না পৌঁছা পর্যন্ত কেউ যেন আসরের নামাজ না পড়ে। পথিমধ্যে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেলে সাহাবিদের মধ্যে দুটি দল তৈরি হয়। একদল সাহাবি রাসুলের নির্দেশের আক্ষরিক অর্থ ধরে নিয়ে বনু কুরাইজায় পৌঁছেই নামাজ পড়ার পক্ষে মত দেন। অন্য দলটি মনে করে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আসলে দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছিলেন, নামাজ কাজা করতে বলেননি। তাই তারা পথেই নামাজ আদায় করে নেন। পরবর্তীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তিনি কোনো দলের প্রতিই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি এবং কাউকে ভুল বা সঠিক বলে অভিযুক্ত করেননি।
আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল জাতুস সালাসিল যুদ্ধের সময়। তীব্র শীতের এক রাতে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আমর ইবনুল আস (রা.)-এর গোসল ফরজ হয়। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গোসল করলে শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কায় তিনি গোসল না করেই তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজের ইমামতি করেন। এতে অন্যান্য সাহাবিরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন তাকে অপবিত্র অবস্থায় নামাজ পড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন আমর ইবনুল আস (রা.) কোরআনের সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, 'তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।' এই যুক্তি শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল হেসেছিলেন এবং তাকে আর কিছুই বলেননি। এভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.) যৌক্তিক মতপার্থক্যের সুযোগ করে দিয়েছেন।
এমনকি ইসলামের দুই মহান ব্যক্তিত্ব আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.)-এর মধ্যেও ব্যক্তিগত মতামতের ক্ষেত্রে প্রায়ই দ্বিমত ও মনোমালিন্য হতো। বদর যুদ্ধের পর যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে আবু বকর (রা.) বন্দীদের জীবিত রেখে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন, যাতে তারা পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ পায়। অন্যদিকে উমর (রা.) মত দিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, এরাই তো আপনাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে, এরাই তো আপনাকে অবিশ্বাস করছে। সুতরাং, আপনি তাদের শিরচ্ছেদ করুন।’ দুজন সিনিয়র সাহাবি দুই ধরনের মত দিচ্ছেন। একজন বলছেন ক্ষমা করার কথা, তো আরেকজন বলছেন শাস্তি দেবার কথা। কিছুক্ষণ পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ কারও হৃদয়কে এতটা কোমল বানিয়েছেন যা দুধের মতো, আবার কারও হৃদয়কে এতটাই কঠিন বানিয়েছেন যা পাথরের মতো। আবু বকর, তুমি হলে ইবরাহিমের (আ.) মতো, যিনি বলেছিলেন, ‘যে আমার অনুসরণ করেছে নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্য হয়েছে তবে নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ইবরাহিম : ৩৬)। আবার আবু বকর, তুমি হলে ঈসার (আ.) মতো। যিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেন তবে তারা আপনারই বান্দা, আর তাদেরকে যদি ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা মায়িদা : ১১৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) দু’জন বিশিষ্ট সাহাবির দ্বিমতকে দু’জন-দু’জন চারজন নবীর সঙ্গে তুলনা করে দেখান, এসব বিষয়ে নবীরাও ভিন্নমত পোষণ করতেন। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) মুক্তিপণের বিনিময়ে বন্দীদেরকে ছেড়ে দেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৩৬৩২)। পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালের ৬৭ নম্বর আয়াতে উমর (রা.)-এর মতকে সমর্থন করে ওহি নাজিল করেন। কিন্তু উমর (রা.) কখনো এই নিয়ে আবু বকর (রা.)-এর সামনে অহংকার করেননি, বরং তারা আগের মতোই একে অপরকে সহযোগিতা করে চলেছেন।
অন্য এক সময়ে বনু তামিম গোত্রের প্রতিনিধি নির্বাচনের সময় আবু বকর (রা.) এবং উমর (রা.) ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র তর্কাতর্কি শুরু হয় এবং একপর্যায়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনেই তাদের কণ্ঠস্বর উঁচু হয়ে যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের ২ নম্বর আয়াত নাজিল করে সতর্ক করেন, মুমিনরা যেন নবীর কণ্ঠস্বরের ওপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু না করে, যাতে তাদের আমল নিষ্ফল না হয়ে যায়। কোরআনের এই নির্দেশ আসার পর উমর (রা.) আস্তে আস্তে কথা বলা শুরু করেন। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কিছু জিজ্ঞেস করলে এমন আস্তে বলতেন যে, দ্বিতীয়বার বলতে হতো। (বোখারি : ৪৮৪৫)। সাহাবিদের এই পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মতপার্থক্যের ঘটনাগুলো আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্নমতের প্রতি সম্মান রেখে ঐক্য বজায় রাখতে হয়।
বনু কুরাইজার অভিযানের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদেরকে বললেন, ‘বনু কুরাইজায় না পৌঁছা পর্যন্ত কেউ আসরের নামাজ পড়বে না।’ একাংশ সাহাবি বনু কুরাইজায় পৌঁছার আগেই আসরের নামাজের সময় হয়ে গেল। এখন তারা কী করবেন? সাহাবিদের মধ্যে দুই ভাগ হয়ে গেল। একভাগ বললেন, আমরা রাসুলের কথামতো বনু কুরাইজায় গিয়েই আসরের নামাজ পড়ব। আরেকভাগ বললেন, আমরা এখনই নামাজ পড়ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) এটা বলতে চাননি যে, সময় হলেও রাস্তায় নামাজ পড়ো না। তার কথার উদ্দেশ্য ছিল, আমরা যেন দ্রুত বনু কুরাইজায় পৌঁছাই। একদল সাহাবি রাসুলুল্লাহর কথার আক্ষরিক অনুসরণ করেন, আরেকদল সাহাবি রাসুলুল্লাহর কথার প্রায়োগিক, উদ্দেশ্যের অনুসরণ করেন। একদল নামাজ পড়েন রাস্তায়, আরেকদল বনু কুরাইজায় পৌঁছে। রাসুলুল্লাহর (সা.) কাছে দুইদল পুরো বিষয়টি জানান। রাসুলুল্লাহ কোনো দলের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেননি।’ (বোখারি : ৪১১৯)।
আমর ইবনুল আস গোসল না করার কারণ বলতে গিয়ে কোরআনের সুরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের রেফারেন্স দেন। ‘তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না।’ একথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) হেসে দিলেন, তাকে আর কিছু বললেন না। (আবু দাউদ : ৩৩৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবারও যৌক্তিক মতপার্থক্যকে নিন্দা করছেন না। মতপার্থক্যের সুযোগ দিচ্ছেন।





























