প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। দুই দেশের পক্ষ থেকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আগ্রহ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত না হওয়ার পেছনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বেশ কিছু কঠিন শর্তকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারত যখন সফরটি আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন হঠাৎ এই শর্তগুলো দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য বিস্ময় হয়ে এসেছে। এর আগে আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত।
তবে এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দিল্লিতে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যকে বাংলাদেশ সরকার ‘নজীরবিহীন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। এই প্রতিক্রিয়ার কয়েক দিন পর ১০ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরদিন তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন এবং দিল্লির নির্দেশনা নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন।
গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক ব্রিফিংয়ে দিল্লি সফরের আগে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তরের শর্ত ভারতকে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, এই শর্তগুলো দুদেশের সম্পর্ককে জটিলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, শর্তগুলো ভারতের জানা থাকলেও এগুলোকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করানোয় বিস্ময় তৈরি হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য জানিয়েছে, বাংলাদেশের অনুরোধ তাদের পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারত শর্ত মেনে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে—এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ অতীতেও ভারত বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে আশ্রয় দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, শর্তের বেড়াজালে আটকে না থেকে আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। তিনি বলেন, পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার বিকল্প নেই। সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরও একই সুরে বলেন, বাংলাদেশ এখন সম্পর্কের একটি পুনর্বিন্যাস বা ‘রিসেট’ চাইছে। তার মতে, শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং তার দলের সংশ্লিষ্টতা বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতির পেছনে তিনটি মূল কারণ চিহ্নিত করা হচ্ছে: ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান ও তার সাম্প্রতিক তৎপরতা, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার চেষ্টা এবং ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের অবিশ্বাস। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। দিল্লিতে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দলটি ভারত থেকে আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। গত ৮ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, কিন্তু ভারত যেন ‘হাসিনা কার্ড’ না খেলে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই দুটি বিষয় একে অপরের বিপরীতমুখী।
ঢাকা এখন ভারতের সঙ্গে কেবল একটি শীর্ষ বৈঠকের চেয়ে সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত করাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সার্বভৌম সমতা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার দাবিও রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ এখন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে অটল থাকতে চায়। তবে এই নতুন বাস্তবতায় দুই দেশ কীভাবে আলোচনার টেবিলে বসবে, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে, সম্পর্কটি কেবল রাজনৈতিক অবিশ্বাসের চোরাবালিতে আটকে না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমীকরণ মাথায় রেখেই ভারতকে রাজনীতির ভাষায় বোঝাতে হবে যে, দুই দেশের স্বার্থ রক্ষায় পারস্পরিক সম্মান ও স্বচ্ছতা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকা বরং আগ্রহী ছিলো দ্বিপক্ষীয় সফরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই দেশের গণমাধ্যমগুলোতে এমনকি সফরের সম্ভাব্য তারিখও দেওয়া হচ্ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঠিক তখনই গত রোববার ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লিখিত বক্তব্যে ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লি সফরের আগে যে সহায়ক পরিবেশের কথা তিনি জানান, সেখানে কয়েকটি শর্তের কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি দেশেও এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের অনেকেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ‘এখানে যেসব শর্ত আছে, এর সবটাই ভারতের জানা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এখানে যেটা দরকার ছিল যে, দু’দেশের মধ্যে কথা হওয়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেটা যত তাড়াতাড়ি হতো, ততো ভালো হতো।
সূত্র: যুগান্তর






























