নিজের চেহারা ও শরীর নিয়ে অনলাইনে প্রতিনিয়ত চলা মন্তব্য ও সমালোচনাকে ‘অস্বাভাবিক’ বলে অভিহিত করেছেন ব্রিটিশ গায়িকা জর্জা স্মিথ। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ২৯ বছর বয়সী এই তারকা তাঁর মানসিক ক্লান্তি বা বার্নআউট, বডি-শেমিং এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। একই সঙ্গে মুক্তি পেয়েছে তাঁর জীবনের তৃতীয় অ্যালবাম ‘হোয়াট আর দ্য অডস’ (What Are the Odds)।
এফএএমএম (FAMM) লেবেল থেকে মুক্তি পাওয়া এই অ্যালবামটি জর্জা স্মিথের আগের কাজগুলোর চেয়ে বেশ আলাদা। সাধারণত অন্তর্মুখী ও আবেগঘন আরঅ্যান্ডবি (R&B) গানের জন্য পরিচিত হলেও, এবার তিনি পুরোপুরি ড্যান্স মিউজিকে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ১২টি গানের এই অ্যালবামটি তৈরি হয়েছে লন্ডনভিত্তিক প্রযোজক রিচার্ড আইসংয়ের সঙ্গে, যিনি ‘পিটুজে’ (P2J) নামে বেশি পরিচিত এবং বিয়ন্সে, বার্না বয় ও টেমসের মতো তারকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। উইজকিড ও ডেভলিনের মতো শিল্পীদের উপস্থিতিতে এই অ্যালবামে ইউকে গ্যারেজ, ফাঙ্কি হাউস, টু-স্টেপ এবং আফ্রোবিটসের এক চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। অ্যালবামের ‘ফর লাইফ’ গানটি মাদকের আসক্তিতে এক বন্ধুকে হারানোর বেদনা নিয়ে, ‘ইয়ং হার্ট’ গানটি জর্জার নিজের তরুণ বয়সের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠি এবং ‘দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ’ বন্ধুত্ব ভেঙে যাওয়ার গল্প বলে।
২০১৬ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ‘ব্লু লাইটস’ গান দিয়ে সংগীতাঙ্গনে পা রাখেন জর্জা। এরপর থেকে তিনি মারকারি ও গ্র্যামি মনোনয়ন এবং দুটি ব্রিট অ্যাওয়ার্ড জিতে ব্রিটিশ সংগীতের অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। ড্রেকের ‘মোর লাইফ’ কিংবা বার্না বয়ের ‘আফ্রিকান জায়ান্ট’-এর মতো জনপ্রিয় অ্যালবামেও তাঁর উপস্থিতি ছিল। তবে তুমুল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও জর্জা সব সময় নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেছেন। আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেখানে তারকাদের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক মনে করা হয়, সেখানে জর্জা নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তিনি জানান, তিনি কখনোই বিখ্যাত হতে চাননি, কেবল কিশোরী বয়সে গান প্রকাশ করে দেখতে চেয়েছিলেন কী হয়। টিকটক ট্রেন্ড বা সেখানে নাচ দেখানোর মতো কাজ করতেও তাঁর ঘোর আপত্তি রয়েছে।
অনেকে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে ‘কামব্যাক’ বা ফিরে আসা হিসেবে দেখছেন। তবে জর্জা এই শব্দটির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘মানুষ বলছে আমি নাকি ফিরে এসেছি! এর মানে কী? আমি ২০১৭ সাল থেকে টানা ট্যুর করছি। আমি আসলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত নই বলেই হয়তো মানুষের এমনটা মনে হচ্ছে।’
খ্যাতির পাশাপাশি জর্জাকে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। খুব অল্প বয়সেই তাঁর চেহারা ও শারীরিক গঠন নিয়ে অনলাইনে ব্যাপক আলোচনা ও যৌন আবেদনময়ী মন্তব্য করা শুরু হয়। ২০২৩ সালে তাঁর দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘ফলিং অর ফ্লাইং’ মুক্তির আগে এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ‘জর্জা স্মিথের ওজন বৃদ্ধি’ (Jorja Smith weight gain) বিষয়টি দুই দিন ধরে ট্রেন্ডিংয়ে ছিল। জর্জা জানান, এই বডি-শেমিং তাঁর আত্মবিশ্বাসকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ বাস্তব চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জর্জা বলেন, ‘সে সময় আমি আসলে প্রথমবারের মতো ঠিকঠাক খাওয়া-দাওয়া শুরু করেছিলাম। এর আগে অতিরিক্ত ব্যস্ততার কারণে আমি প্রায়ই খাবার খেতাম না এবং প্রতিদিন নিয়ম না মেনে পাগলের মতো দৌড়াতাম। যখন আমি নিজেকে সবচেয়ে সুস্থ অনুভব করছিলাম, ঠিক তখনই মানুষ আমার সমালোচনা করতে শুরু করল। এটি আমার জন্য এক বড় মানসিক ধাক্কা ছিল।’
এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে জর্জা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এখন তিনি নিজে আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন না, তাঁর দল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে। এক্সে তিনি বহু বছর ধরে যান না। মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে তিনি এখন হাঁটাহাঁটি করেন বা জিমে যান।
লন্ডন বা বার্মিংহাম নয়, জর্জা স্মিথ গর্বের সঙ্গে মনে করিয়ে দেন যে তাঁর বেড়ে ওঠা ওয়ালসল (Walsall) শহরে। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর স্পটিফাইয়ের ‘হোমটাউন বিলবোর্ড’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে ওয়ালসল অ্যারেনায় একটি বিশেষ শো করতে যাচ্ছেন তিনি। এই শোতে তাঁর শৈশবের বন্ধু ওয়েসলি জোসেফ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ব্লু লাইটস কোয়ার’ পারফর্ম করবে। জর্জা আশা করেন, এই আয়োজন ওয়ালসলের তরুণ প্রজন্মকে বড় স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।
গান ছাড়াও নিজের একটি স্বাভাবিক জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন জর্জা। তিনি রান্না করা এবং আবার দৌড়ানো শুরু করেছেন, এমনকি আগামী বছরের লন্ডন ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার জন্য নামও লিখিয়েছেন। সম্প্রতি এক বন্ধুর পরামর্শে নিজের গুটিয়ে থাকার মানসিকতা ভেঙে ভোগের (Vogue) একটি পার্টিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। জর্জা বলেন, ‘সবকিছুর মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রাখাই আসল কথা। এখন আমি বেশ ভালো বোধ করছি, আবার সেই আগের জর্জা হয়ে উঠছি।’






























