২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বেইজিংয়ের সাথে সম্ভাব্য যুদ্ধ মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে টানা ১০ দিন ধরে সামরিক মহড়া চালিয়েছে তাইপেই। তাইওয়ানের বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ মহড়ায় এবার অবরোধ পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং শান্তিকালীন অবস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপান্তরের মতো পরিস্থিতিগুলো অনুশীলন করা হয়। তবে বিগত বছরগুলোর মতো এবার শুরুতেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়নি বেইজিং। মহড়ার একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারা এটিকে একটি "অপব্যয়ী তামাশা" বলে উড়িয়ে দেয়।
বাস্তবে বেইজিং এখন তাইওয়ান প্রণালীতে নিজস্ব এক ধরনের ‘অস্পষ্টতা’র নীতি তৈরি করছে। তাইওয়ানের চারপাশে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এখনও সক্রিয় থাকলেও, তাদের চাপের ধরন বদলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানকে ঘিরে যেভাবে বড় ধরনের সামরিক মহড়া ও শক্তি প্রদর্শন করা হতো, তার তুলনায় বেইজিংয়ের সামরিক উপস্থিতি এখন কিছুটা কম দৃশ্যমান। প্রকাশ্য কোনো সূত্র থেকে এটি নিশ্চিত করা না গেলেও, সামগ্রিক চিত্রটি বেশ স্পষ্ট। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে তাইওয়ানের আকাশে চীনা যুদ্ধবিমানের অনুপ্রবেশ গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
যুদ্ধবিমানের এই হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি অবশ্য তাইওয়ানকে জোরপূর্বক একীভূত করার জন্য বেইজিংয়ের ক্রমাগত সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানোর প্রচলিত ধারণার সাথে মেলে না। বরং এটি ইঙ্গিত করে যে, চীন এখন দৃশ্যমান সামরিক বলপ্রয়োগের পথ থেকে সরে এসে এমন কিছু কৌশলের দিকে ঝুঁকছে, যা সহজে চিহ্নিত করা যায় না।
উদাহরণস্বরূপ, আকাশে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমলেও সমুদ্রসীমায় চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। গত জুনে তাইওয়ানের চারপাশে অন্তত ৫৫ বার চীনের সরকারি জাহাজের উপস্থিতি রেকর্ড করেছে তাইপেই, যার মধ্যে কোস্টগার্ড ও গবেষণা জাহাজও রয়েছে। এই সংখ্যা মে মাসের তুলনায় ৮৩ শতাংশ এবং আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২০ শতাংশ বেশি। এছাড়া চীন এখন তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে কোস্টগার্ডের টহল শুরু করেছে। বেইজিং এগুলোকে সামরিক অভিযান না বলে চীনা এখতিয়ারভুক্ত জলসীমায় "নিয়মিত আইন প্রয়োগকারী টহল" হিসেবে বর্ণনা করছে।
অর্থাৎ, বেইজিং চাপ কমাচ্ছে না, বরং চাপের রূপ পরিবর্তন করছে। এই ‘ধূসর এলাকার’ (গ্রে-জোন) তৎপরতা সামরিক আগ্রাসন এবং বেসামরিক আইন প্রয়োগের মধ্যকার পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে তুলছে। এর ফলে তাইওয়ান প্রণালীতে একটি নতুন দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের একটি বড় অংশ এখন বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান নিয়ে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’র অবসান ঘটিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার দাবি তুলছে। অন্যদিকে, বেইজিং নিজেই এখন এই অস্পষ্টতার নীতিকে নিজের মতো করে ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
কয়েক দশক ধরে ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ ছিল মূলত আমেরিকার একটি হাতিয়ার। তবে এর উদ্দেশ্য শুধু চীনকে প্রতিহত করা ছিল না, বরং উভয় পক্ষকে সংযত রাখা। বেইজিং যেমন নিশ্চিত ছিল না যে তাইওয়ান আক্রমণ করলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কি না, তেমনি তাইপেই-ও জানত না যে তারা একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে ওয়াশিংটন তাদের কতটা সমর্থন করবে।
যদিও ওয়াশিংটন গণপ্রজাতন্ত্রী চীনকে (পিআরসি) চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাইওয়ানের সাথে কেবল অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন নীতি’ বেইজিংয়ের ‘এক চীন নীতিগত অবস্থান’ থেকে আলাদা। ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে বেইজিংয়ের দাবিকে স্বীকার করলেও সার্বভৌমত্বের দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের স্বাধীনতাকেও সমর্থন করে না।
এই রাজনৈতিক অস্পষ্টতা দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ান প্রণালী তথা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ওয়াশিংটনে এখন ‘কৌশলগত স্পষ্টতা’র দাবি জোরালো হচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের একাংশের যুক্তি, চীনের সামরিক সক্ষমতা এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যেকোনো ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি এখন আরও ভয়াবহ হতে পারে।
তবে কৌশলগত স্পষ্টতা তাইওয়ান প্রণালীতে শান্তি ফিরিয়ে আনার নিশ্চয়তা দেয় না। দ্বিমুখী নিয়ন্ত্রণের এই পুরনো ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে উভয় পক্ষই নতুন ব্যবস্থার সীমা পরীক্ষা করতে উৎসাহিত হতে পারে। বিশেষ করে বেইজিংয়ের জন্য আমেরিকার স্পষ্ট লাল রেখাগুলো এড়িয়ে তার নিচ দিয়ে ধূসর এলাকায় তৎপরতা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কয়েক দশক ধরে বজায় থাকা এই স্থিতিশীলতা আসলে কোনো যৌথ সমঝোতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি, বরং স্থিতাবস্থা বজায় রাখার ইচ্ছার ওপর টিকে ছিল। মে মাসে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, "প্রণালীর দুই পাশই এক চীনের অংশ এবং এটিই তাইওয়ান প্রণালীর প্রকৃত স্থিতাবস্থা।" বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে তারা স্থিতাবস্থা পরিবর্তন করছে না, বরং তাইওয়ানের নেতারা এবং বহিরাগত শক্তিগুলো ‘এক চীন’ কাঠামোকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
এই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তাইপেই চীনের কোস্টগার্ড ও বেসামরিক জাহাজের টহলকে তাদের জলসীমায় বেইজিংয়ের অনধিকার চর্চা হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন এটিকে যুদ্ধের সীমার নিচে রেখে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে। আর বেইজিংয়ের আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তি অনুযায়ী, তাইওয়ান যেহেতু চীনের অংশ, তাই সেখানে চীনা কোস্টগার্ডের টহল দেওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগকারী বিষয় মাত্র।




























