২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর ভয়াবহ নির্যাতন ও গণহত্যার মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। সেই ঢলের নয় বছর পূর্ণ হয়ে আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সংকটটি দশম বছরে পদার্পণ করল। দীর্ঘ এই এক দশকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের সাত বছর, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। তবে প্রতিটি সরকারই রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়ে একমত থাকলেও, বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া এখনো অধরা রয়ে গেছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে ১৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে বিগত সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতাকে দায়ী করছে বর্তমান বিএনপি সরকার। ছয় মাস আগে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকার বলছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়াই এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বরাবরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কূটকৌশল অবলম্বন করে আসছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারা তালিকার বিষয়ে গড়িমসি করে এবং নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দেয়। চলতি মাসে মিয়ানমার দাবি করেছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে তাদের দাবি।
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে তাদের জাতিগত অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে। তবে ঢাকা এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়েকে তলব করে জানিয়েছে, তাদের দেওয়া তথ্যে অনেক ভুল পরিসংখ্যান রয়েছে। জাতিসংঘের নিবন্ধনের তথ্যের ভিত্তিতেই সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা উচিত। এছাড়া ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশু এবং ২০১৭ সালের পরবর্তী সময়ে আসা নবাগতদেরও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য মিয়ানমারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এই সংকটকে ১০ থেকে ২০ বছরে রূপান্তর হতে না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই সমাধানও তাদেরই করতে হবে। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মানবিক সহায়তা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়, বরং এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা।
পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের মতে, রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপাক্ষিক ইস্যু নয়, বরং এটি বঙ্গোপসাগর, আসিয়ান এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, রাজনৈতিক, আইনি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এই বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে, যা মানবিক সহায়তা দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে মিয়ানমার কালক্ষেপণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অং সান সু চির সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই করেছিল। ২০১৯ সালে দুই দফায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও মিয়ানমারের ওপর আস্থাহীনতার কারণে তা ব্যর্থ হয়। এরপর কোভিড মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ সরে যায়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা দখলের পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে।
পরবর্তী সময়ে চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে কয়েকবার প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করা হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে গেছে। বাংলাদেশ এমন একটি সংকটের বোঝা বহন করছে যা তারা তৈরি করেনি, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক মনোযোগ ও কার্যকর পদক্ষেপই এখন প্রত্যাবাসনের একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এই সময়ে মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের ৭ বছর, অধ্যাপক ড। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শুধু তাই নয়, কবে নাগাদ রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করা যাবে বা আদৌ রোহিঙ্গাদের রাখাইনে পাঠানো সম্ভব হবে কি না— সেই প্রশ্ন প্রতি বছরের এই সময়ে সামনে আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশকে যেসব পরামর্শ বা প্রস্তাব দেওয়া হয়, সেগুলো মিয়ানমার সরকারকেও স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হলেই নতুন সরকারের কাছে আগের তালিকা বাদ দিয়ে নতুন তালিকা সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভেরিফিকেশনের ক্ষেত্রে নতুন যোগ করা তথ্যাবলিও বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করেছে ঢাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেজন্য একটি শঙ্কার কথা তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, এ সংকটকে ১০ থেকে ২০ বছরে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।



























