সিডনি থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা দক্ষিণের একটি ছোট শহরে স্যুটকেসের ভেতর ক্ষতবিক্ষত এক নারীর লাশ পড়ে থাকতে দেখে আঁতকে উঠেছিলেন দুই নাগরিক। তারা দ্রুত স্থানীয় পুলিশকে খবর দিলে পুলিশও একটি মরদেহ পাওয়ার বিবৃতি জারি করে। পুরো অস্ট্রেলিয়া যখন আরও একটি নারী হত্যার আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল, তখনই জানা গেল এক অদ্ভুত সত্য। ফরেনসিক পরীক্ষার পর পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, সেটি কোনো নারীর মৃতদেহ নয়, বরং কৃত্রিম আঘাতের চিহ্ন বা 'ফেব্রিকড ব্রুজ' আঁকা একটি সেক্স ডল (যৌন পুতুল), যা একটি নির্জন মাটির রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের কিছু দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মতো দেখতে না হলে সেক্স ডল রাখা অবৈধ নয় বলে পুলিশ দ্রুতই তাদের তদন্ত বন্ধ করে দেয়। তবে এই ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা সেক্স ডল বাজারের এক অন্ধকার দিক ও এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
২০২৬ সালের একটি বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী সেক্স ডলের বাজার ছিল ৬৬০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ১ হাজার ৩৪০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বাজারের ব্যাপক প্রসারের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক প্রযুক্তি। ২০১৭ সালে 'রিয়েলডল' নামক প্রতিষ্ঠান তাদের এআই-চালিত সেক্স রোবট 'হারমোনি' বাজারে এনেছিল। চলতি বছর আসতে যাওয়া তাদের নতুন মডেলে ক্রেতারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পুতুলের ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারবেন, যেমন 'আধ্যাত্মিক' বা 'অনিরাপদ'। এতে রয়েছে একটি বিশেষ 'এআই ভ্যাজাইনা', যা ব্লুটুথের মাধ্যমে এক্স-মোড অ্যাপের সাথে যুক্ত হয়ে স্পর্শ, গতি ও নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী কণ্ঠস্বরের প্রতিক্রিয়া দেয়।
ইউনিভার্সিটি অব ডুইসবার্গ-এসেন-এর ফরেনসিক সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড সেক্স রিসার্চের প্রধান জোহানেস ফুস এবং গবেষক জিন সি ডেসবুলেক্স সেক্স ডলের মানবিকীকরণ এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। ফুস মনে করেন, নারীর অবয়বকে এভাবে যত্রতত্র ফেলে দেওয়া বা অবমাননা করা নারীদের প্রতি সমাজের বিদ্বেষমূলক মনোভাবেরই অংশ। তবে এই পুতুলগুলো অপরাধের ঝুঁকি কমায় নাকি বাড়ায়, সে বিষয়ে এখনো কোনো দীর্ঘমেয়াদী তথ্য নেই। ফুস বলেন, কোনো আবেগীয় চাহিদা বা সংলাপ ছাড়া সম্পূর্ণ প্রাপ্যতা এবং আকর্ষণীয় তরুণ শরীরই এই পুতুলগুলোর মূল আকর্ষণ।
কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির সেন্টার ফর জাস্টিসের অপরাধবিজ্ঞানী অধ্যাপক কেলি রিচার্ডস বলেন, অনেক পুরুষ এই পুতুলগুলোকে নারী হিসেবেই দেখে, কিন্তু তারা কি বাস্তব নারীদের মানুষ হিসেবে গণ্য করে? তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে লিঙ্গ সমতা যখন পেছনের দিকে যাচ্ছে, তখন সেক্স ডলগুলো তারই চরম রূপ প্রকাশ করছে। অন্যদিকে, 'ডল ফোরাম' নামক ওয়েবসাইটে এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, "গার্লফ্রেন্ড কেবল তাদের জন্যই, যারা এখনো সঠিক পুতুলটি খুঁজে পায়নি।" তবে অ্যাডিলেডের 'নটি বাই নেচার অ্যাডাল্ট স্টোর'-এর মালিক ট্যামি পেইন বলেন, সেক্স ডল ব্যবহারকারীদের নিয়ে সমাজে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে এবং গোলবার্নের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো ক্রেতাগোষ্ঠীকে বিচার করা ঠিক নয়।
কোয়েরোস (Coeros) নামক একটি প্রতিষ্ঠান কোনো নারীর ছবি ব্যবহার করে হুবহু কাস্টম পুতুল তৈরির সুবিধা দেয়। এ বিষয়ে তাদের মুখপাত্র জানান, তারা সম্মতি ছাড়া কারও ছবি ব্যবহার বা হয়রানি সমর্থন করেন না। তবে ডল ফোরামের এক সদস্য লিখেছেন, "যে নারীরা আপনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তাদের পুতুল বানানোর জন্য এটি দারুণ সুযোগ।" একটি কাস্টম পুতুলের মাথার দাম প্রায় ১,৭৯০ মার্কিন ডলার। 'সেক্স ডলস, রোবটস অ্যান্ড ওম্যান হেটিং: দ্য কেস ফর রেজিস্ট্যান্স' বইয়ের লেখক ক্যাটলিন রোপার এদের "প্রতিকৃতি নারী যৌনদাসী" বলে অভিহিত করেছেন এবং এগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে গত মাসে এক ১৬ বছর বয়সী ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে ২৩ বছর বয়সী জ্যাং ইউন-গি দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে একটি ক্ষতিগ্রস্ত সেক্স ডল পাওয়া গিয়েছিল।
পুতুলগুলোর ফেলে দেওয়ার প্রক্রিয়াও বেশ জটিল। গোলবার্নের ঘটনায় পুলিশের ২০ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছে। অ্যাডিলেডের এক ব্যক্তি তাঁর ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার পুতুলটি ডল ফোরামে বিনামূল্যে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, কারণ এর যৌনাঙ্গটি ক্ষতিগ্রস্ত ছিল এবং সেটি ফেলে দেওয়া ঝামেলার। রেডিটেও এমন অনেক পুতুলের ছবি পাওয়া যায় যেগুলোর স্তনবৃন্ত বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত এবং মুখ অবহেলায় ছত্রাকাক্রান্ত। ডল ফোরামের এক ব্যবহারকারী পুতুল ফেলে দেওয়ার উপায় হিসেবে চেইনসো ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, "আপনার মনের ভেতরের চেইনসো ম্যাসাকার ফ্যান্টাসিটি বাস্তবে রূপ দিন!"




























