মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মামলা তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং মাদকবিরোধী অভিযানের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও দীর্ঘ সময় একই পদে আটকে থাকতে হচ্ছে নন-বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের। বছরের পর বছর পদোন্নতি না পাওয়ায় তাদের পেশাগত মনোবল ও কর্মস্পৃহা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে এই পদোন্নতি জটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
স্থবির ক্যারিয়ার ও পদোন্নতির জটিলতা
বিভাগীয় পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করে ‘প্রমোশন লিস্টে’ (পিএল) নাম ওঠার পরও প্রায় তিন হাজার নন-বিসিএস কর্মকর্তা পদোন্নতি পাচ্ছেন না। এসআই থেকে পরিদর্শক পদে উন্নীত হওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। মাঠপর্যায়ের কঠোর ডিউটির পাশাপাশি এই কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি না মেলায় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
ব্যাচভিত্তিক দীর্ঘসূত্রতার চিত্র
- ২০১২ সালে যোগ দেওয়া ৩৩তম ব্যাচের একজন এসআই জানান, প্রায় ১৪ বছর ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
- ৩৪ ও ৩৫তম ব্যাচের কর্মকর্তারা জানান, ১০ থেকে ১২ বছর চাকরি করার পরও তাদের পদোন্নতি হয়নি, অথচ সম্প্রতি যোগ দেওয়া কর্মকর্তারাও একই পদমর্যাদায় কাজ করছেন।
- দীর্ঘদিন একই পদে আটকে থাকায় সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও তারা অস্বস্তির সম্মুখীন হচ্ছেন।
পদোন্নতি জটের নেতিবাচক প্রভাব
পুলিশের ৩৩ শতাংশ কোটা পূরণ না হওয়া এবং উচ্চতর পর্যায়ে নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিচের স্তরে পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এই স্থবিরতা মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহায় ভাটা পড়লে তার প্রভাব সরাসরি জননিরাপত্তার ওপর পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ ও অস্বচ্ছতার শঙ্কা
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনেক সময় মেধা ও জ্যেষ্ঠতার চেয়ে বাহ্যিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পায়। এছাড়া, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়াই তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। তেজগাঁও থানায় কর্মরত এক এসআই জানান, পদোন্নতি নিয়ে আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এখন তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের কষ্টের কথা পৌঁছালেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
সমাধানের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জটিলতা নিরসনে নতুন পদ সৃষ্টি করা এবং উচ্চপর্যায়ে পদোন্নতির সুযোগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পিএলভুক্ত কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তাদের পেশাগত উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে পুলিশের সেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ. এম. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিদর্শক পর্যায়েও একই সংকট
পদোন্নতির এই জট কেবল এসআই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়েও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। এসআই থেকে পরিদর্শক পদে পদোন্নতি না পাওয়ায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা সামগ্রিক পুলিশি সেবার মান কমিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত এই জট না খুললে মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, একই পদে এক দশক বা তারও বেশি সময় কাটিয়ে দেওয়ায় তাদের অনেকের মধ্যেই পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে, সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় তারা কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তার মন্তব্য, ‘পদোন্নতি নিয়ে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নিয়মিত, কিন্তু আমার কাছে দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঠপর্যায়ের নিয়মিত ডিউটি পালনের পাশাপাশি এসব কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ প্রথমবারেই সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলে পদোন্নতি পেতে সাধারণত সাত থেকে আট বছর সময় লাগে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার এসআই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পিএলভুক্ত হলেও তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে।






























