জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সাধারণত ক্ষমতাসীন দল কিংবা জোট রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনীত করলে বিরোধী দল বা অন্য কোনো জোট প্রার্থী মনোনীত করেন না। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব নিয়ে সংসদে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিএনপির প্রার্থীই নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তবে এমন বাস্তবতায়ও দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ঘোষণা দিয়েছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। ফলে তিন যুগ পর আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এর আগে জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হলে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদে ভোটাভুটি হয়েছিল। তখন জাতীয় সংসদে সরকারি দল বিএনপি প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করায় মেয়াদপূর্তির আগেই এ নির্বাচনের আয়োজন করতে হচ্ছে নির্বাচন কমিশনকে। গত বৃহস্পতিবার ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিল ১৩ আগস্ট, বাছাই ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৮ আগস্ট। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’র দায়িত্ব পালন করছেন।
আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গিয়ে গতকাল রবিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী কর্তার কার্যালয় থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, বিএনপির প্রতিনিধি দল দুপুর ২টায় মনোনয়নপত্র নিয়ে গেছেন। রুহুল কবির রিজভী আহমেদ এবং নূরুল ইসলাম মণি এই ফর্ম সংগ্রহ করেছেন। যদিও কার পক্ষে মনোনয়ন সংগ্রহ করা হয়েছে তা জানায়নি বিএনপি, তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনায় রয়েছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিধিমালা অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমার ক্ষেত্রে প্রার্থীর উপস্থিতির বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রার্থীর সই করা মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক বা সমর্থক হিসেবে সংসদ সদস্যের উপস্থিতি আবশ্যক। একক প্রার্থী থাকলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবে; একাধিক হলে ভোটাভুটি হবে।
এদিকে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি প্রেসিডেন্ট অলি আহমদের নাম ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল রবিবার বেইলি রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে এক বৈঠকের পর জোটের শীর্ষ নেতারা অলি আহমদকে পাশে নিয়ে এ ঘোষণা দেন। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে এবং আমাদের দায়িত্ব হিসেবে আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমরা সর্বসম্মতভাবে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী দিয়েছি। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এখনও ইসি থেকে মনোনয়ন সংগ্রহ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে সংসদ অধিবেশন ডাকা দরকার আছে কি নেই, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য সংসদ অধিবেশন বাধ্যতামূলক নয়। সংসদ সদস্যরা তাকে নির্বাচিত করবেন। নির্বাচনের জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকতে চাইলে ডাকতে পারেন, তবে সাধারণ অধিবেশন হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি আমাদের সময়কে বলেছেন, সংসদেও অধিবেশন ডাকা হবে না। সবাইকে ভোটদানে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে।
সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না, যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়সী হন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন অথবা সংবিধান অনুযায়ী অভিশংসনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে কোনো মনোনয়ন ফি দিতে হয় না। প্রার্থীকে বর্তমান সংসদ সদস্য হতে হবে না, তবে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে কার্যভার গ্রহণের দিন তার সংসদীয় আসন শূন্য হবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গোপন নয়, বরং প্রকাশ্য। প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি ভোট থাকে। ভোটার ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে স্বাক্ষর করে সেটি সংগ্রহ করেন এবং যাকে ভোট দেবেন, তার নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া প্রার্থী নির্বাচিত হবেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিল ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আজ থেকে আমরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন-২০২৬ এর আলোকে মনোনয়নপত্র দেওয়া শুরু করেছি।
আর এখন পর্যন্ত আর কেউ, কোনো দল বা কোনো প্রার্থী আমাদের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র নেননি।
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমান ভোট পেলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
সূত্র: Dainik Amader Shomoy





























