১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নানা ওঠানামা দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক সমীকরণের কারণে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন কৌশলগত পুনর্বিন্যাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতে আরও ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও আঞ্চলিক অংশীদারত্বের নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় ছিল, বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব পালন করে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি বাস্তবমুখী ও বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেছে। এই নতুন কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আওতায় পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নতুন সমন্বয় করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ ১৩ বছর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের মাধ্যমে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়। ওই বছরের ২৪ আগস্ট ঢাকায় উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য স্বাভাবিককরণ, ভিসা সহজীকরণ, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা সংক্রান্ত ছয়টি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া, ২০০৫ সালের পর নিষ্ক্রিয় থাকা যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনকে (জেইসি) ২০২৫ সালের আগস্টে পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে একটি বড় বাস্তব ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সংযোগের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক ছিল ২০২৪ সালে করাচি ও চট্টগ্রামের মধ্যে সরাসরি সমুদ্রপথে সফল নৌযোগাযোগ স্থাপন। আগে কলম্বো হয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগলেও, এই সরাসরি রুটের কারণে কোনো মধ্যবর্তী স্থানান্তর ছাড়াই পণ্য পরিবহন সম্ভব হচ্ছে, যা যাতায়াত সময় ৫০ শতাংশেরও বেশি কমিয়ে প্রায় ১১ দিনে নামিয়ে এনেছে। এই সরাসরি রুটটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) লজিস্টিক করিডোরকে সমর্থন করার পাশাপাশি পাকিস্তানের গোয়েদার বন্দরের সাথে চট্টগ্রামকে যুক্ত করে দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করছে। এর ফলে আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের আনুমানিক ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে প্রবেশাধিকারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের বহুজাতিক সামুদ্রিক মহড়া ‘আমান-২০২৫’-এ বাংলাদেশ অংশ নেয়। এর আগে ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১৩ সালেও বাংলাদেশ এই মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। তাছাড়া, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ‘ইন্দাস শিল্ড ২০২৪’ মহড়ায় বাংলাদেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিল। বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ সামরিক আধুনিকায়ন পরিকল্পনার আওতায় পাকিস্তানের জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়টিও দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে পেশাগত সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমিতে বাংলাদেশি পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষা খাতেও দুই দেশের মধ্যে বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে ওআইসি ও কমস্টেকের বৃত্তির আওতায় ৪০০-এর বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাকিস্তানে অধ্যয়ন করছেন। ২০২৫ সালে চালু হওয়া ৫০ কোটি ডলারের ‘পাকিস্তান-বাংলাদেশ নলেজ করিডোর’ উদ্যোগের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে ৫০০টি বৃত্তি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দুই দেশই প্রতি ৩-৪ বছর পর ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়ে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জলবায়ুজনিত কারণে পাকিস্তানে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.২ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা দুই দেশের জলবায়ু সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই কৌশলগত পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। বাংলাদেশের এই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি ভারতের জন্য পূর্ব সীমান্তে নতুন কৌশলগত অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং ঢাকায় দিল্লির আগের প্রভাবশালী অবস্থানকে কিছুটা শিথিল করতে পারে। অপরদিকে, চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ অক্ষের সক্রিয়তা বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করবে। একই সাথে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ ওয়াশিংটনের সাথে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখে বেইজিং ও ইসলামাবাদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ বা ‘হেজিং’ কৌশল বজায় রাখছে।
তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই নতুন যাত্রায় কিছু ঐতিহাসিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এখনো রয়ে গেছে। পাকিস্তানে বসবাসরত প্রায় ১৬ থেকে ২০ লাখ বাঙালি এবং বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ উর্দুভাষী বিহারির অমীমাংসিত নাগরিকত্ব ও সামাজিক অবস্থা এখনো সংবেদনশীল বিষয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অতীতের বিরোধকে একপাশে রেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সাথে একাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক সংলাপের মাধ্যমে অভিন্ন ঐতিহাসিক মানবিক ক্ষতি স্বীকার করে একতরফা দোষারোপ এড়ানো জরুরি।





























