কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবেল্যার্দো দে লা এস্প্রিয়েলা বুধবার সন্ধ্যায় এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এই দুর্যোগে ২৫ হাজার ৮০০-এর বেশি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৫০০ হলেও, বেসামরিক বিভিন্ন তথ্যে এই সংখ্যা ৪ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট দে লা এস্প্রিয়েলা সাংবাদিকদের বলেছেন, তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা এখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারের দিকে নিবদ্ধ।
ভূমিকম্পে রাস্তাঘাট ধসে পড়েছে, গাড়ি দুমড়েমুচড়ে গেছে এবং অনেক ভবন মাটির সাথে মিশে গেছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে কালি, পেরেইরা, মানিযালেস এবং কিবদো। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিতদের সন্ধানে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্যোগের প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তবে খাবার ও পানির সুযোগ থাকলে এই সময়সীমা বাড়তে পারে। কালির মেয়র আলেহান্দ্রো এডের জানিয়েছেন, উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পাচ্ছেন এবং তাদের জীবিত উদ্ধারে প্রতি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান।
উদ্ধার অভিযানের কিছু হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যও সামনে এসেছে। পেরেইরায় ১২ ঘণ্টার জটিল অভিযানের পর ৩২ বছর বয়সী দানিয়ালা লার্গোকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের ভেতর ছোট একটি ছিদ্র করে তার আটকে থাকা হাত মুক্ত করেন এবং একজন চিকিৎসক তাকে স্থিতিশীল করতে স্যালাইন দেন। উদ্ধার হওয়ার পর তাকে নীল কম্বলে জড়িয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এর আগে, কালিতে ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে উদ্ধারকারীদের কাছে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, "আমি একটি শিশুর সাথে আছি।" তবে একই সাথে শোকের ছায়াও নেমে এসেছে, যখন পেরেইরায় ধ্বংসস্তূপ থেকে এক ব্যক্তিকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩০টি আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে পার্ক, স্কুল বা স্পোর্টস এরিনায় আশ্রয় নিয়েছেন। কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সার্ভিসের অধ্যাপক রদ্রিগো লেওন লোয়া জানিয়েছেন, একই এলাকায় পুনরায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কম হলেও, কলম্বিয়া সক্রিয় ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত হওয়ায় নতুন করে ভূকম্পন হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেয়া যায় না।
চোকো প্রদেশের মতো দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে। দারিদ্র্য এবং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সেখানে ত্রাণ পৌঁছানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের জিওভানি রিজ্জোর মতে, এই ভূমিকম্প বিদ্যমান মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করেছে। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে, শান্তি চুক্তির সুবাদে সেখানে আগে থেকেই তাদের উপস্থিতি থাকায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে এবং সোমবার থেকেই তাদের দুর্যোগ মোকাবিলা দল কাজ শুরু করেছে। মেক্সিকো সামরিক বিমানে করে ১৯.৫ টন খাদ্যসহায়তা এবং ১৯ জন নিরাপত্তা সদস্য পাঠিয়েছে, আরও ৩৯ টন সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি রয়েছে। এছাড়া আরও ২৫৫ জন সামরিক বিশেষজ্ঞ ও ২০টি কুকুর প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে ১০০ টন ত্রাণ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন। পোপ লিও চতুর্দশ ভূমিকম্পে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রার্থনা করেছেন এবং সংহতি প্রকাশ করেছেন। এছাড়া, ভেনিজুয়েলা ও কলম্বিয়ার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ১৬ আগস্ট মায়ামিতে মার্ক অ্যান্থনি, লুইস ফনসি, চেইনি, ফিড ও জে হুইলারসহ অন্যান্য শিল্পীরা একটি কনসার্টে অংশ নেবেন।






























