১৯৬৫ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর যখন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছিল সিঙ্গাপুর, তখন তাদের সামরিক বাহিনী গঠনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ইসরায়েল। তবে দীর্ঘদিনের সেই ঐতিহাসিক কৃতজ্ঞতাবোধের মধ্যেও সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রতি নিজেদের স্বাধীন ও কঠোর অবস্থান প্রকাশ করতে শুরু করেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নগর-রাষ্ট্রটি। বন্ধুত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইন ও নীতির প্রশ্নে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে এক কঠিন কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখছে সিঙ্গাপুর।
সিঙ্গাপুরের স্বাধীনতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে বিভিন্ন দেশের সাহায্য চেয়েছিলেন। অন্যান্য দেশ ফিরিয়ে দিলেও ইসরায়েল এগিয়ে আসে। তাদের সামরিক উপদেষ্টারা 'ব্রাউন বুক' নামে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে সিঙ্গাপুর সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে। এমনকি সিঙ্গাপুরের জাতীয় সেবা (ন্যাশনাল সার্ভিস) ব্যবস্থাও ইসরায়েলি মডেলের আদলে তৈরি। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা এড়াতে এই সহযোগিতা দীর্ঘ সময় গোপন রাখা হয়েছিল। সে সময় সিঙ্গাপুরে আসা ইসরায়েলি সামরিক উপদেষ্টাদের ছদ্মনাম দেওয়া হয়েছিল 'মেক্সিকান'।
সময়ের সাথে সাথে এই সম্পর্ক প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা ও জীবন বিজ্ঞানের মতো ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুর এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে চরমপন্থী সহিংসতার দায়ে চার ইসরায়েলি নাগরিকের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি ইসরায়েল সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর কার্যকর করা হয়েছিল। এছাড়া একই বছরের শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো ১০টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও সিঙ্গাপুর তা থেকে বিরত থাকে।
এই কূটনৈতিক অবস্থানের ব্যাখ্যা দিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণান পার্লামেন্টে বলেন, সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা বজায় রাখতে প্রয়োজনে বন্ধু রাষ্ট্রকেও 'না' বলার ক্ষমতা থাকতে হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার, তবে ফিলিস্তিনি সরকারকে অবশ্যই ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার স্বীকার করতে হবে এবং সন্ত্রাসবাদ বর্জন করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের ওপর সিঙ্গাপুরের নিজস্ব নিরাপত্তা নির্ভরশীল থাকায় তারা এই নীতিতে অটল রয়েছে।
সিঙ্গাপুরের এই কূটনৈতিক ভারসাম্যের পেছনে অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং সিঙ্গাপুরের মুসলিম জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি গভীর সহানুভূতি রয়েছে। তবে এই আবেগ যেন দেশের অভ্যন্তরে জাতিগত বা ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি না করে, সে বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর সিঙ্গাপুর সরকার। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ ব্যান্ড 'ম্যাসিভ অ্যাটাক'-এর দুই সদস্য কনসার্টে ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন এবং "ফ্রি ফিলিস্তিন" স্লোগান দেওয়ায় তাদের তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়। পরবর্তীতে তাদের সিঙ্গাপুরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
ইসরায়েলের সঙ্গে সিঙ্গাপুরের সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর ও বহুমুখী হলেও তা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শাতীত নয়। একটি ছোট রাষ্ট্র হিসেবে সিঙ্গাপুর প্রমাণ করছে যে, বন্ধুত্ব বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে সব সিদ্ধান্তেই অন্ধ সমর্থন দিতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এই কঠিন কূটনৈতিক পথেই হাঁটছে সিঙ্গাপুর।






























