ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে শনিবার ভোরে আঘাত হানা একটি শক্তিশালী ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন সংস্থা (বিএনপিবি) জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে নিহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং বহু মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছেন। শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের পর ডজনখানেক আফটারশক বা অনুকম্পন অনুভূত হয়েছে, যার ফলে ওই অঞ্চলের অসংখ্য ঘরবাড়ি ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া ও ভূপদার্থবিদ্যা সংস্থা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৫টার কিছু আগে (গ্রিনিচ মান সময় শুক্রবার ২২:০০টা) এই কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার গভীরে। সাধারণত ভূমিকম্পের গভীরতা যত কম হয়, ভূপৃষ্ঠে তার ধ্বংসক্ষমতা তত বেশি হয়ে থাকে। পর্যটন দ্বীপ বালি থেকে প্রায় ১,০০০ কিলোমিটার (৬০০ মাইল) দূরে অবস্থিত ফ্লোরেস দ্বীপে এই শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বেশ কয়েকটি তীব্র আফটারশক অনুভূত হয়, যার মধ্যে একটির মাত্রা ছিল ৬.১।
পূর্ব নুসা তেঙ্গারা প্রদেশের গভর্নর ইমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, নিহতদের বেশিরভাগই ঘুমের মধ্যে ঘরবাড়ি ভেঙে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন। সিকা প্রদেশের উপকূলীয় গ্রাম তালিবুরার বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তো জানান, প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে তার ঘুম ভেঙে যায় এবং তিনি দ্রুত তার সন্তানের ঘরে ছুটে যান। তিনি বিবিসিকে বলেন, সুনামির আশঙ্কায় অনেক মানুষ ইতিমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে গেছেন। সমুদ্রের পানি নেমে যেতে দেখে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। স্থানীয় একটি কমিউনিটি হেলথ সেন্টারও খালি করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর জারি করা সুনামি সতর্কতা প্রায় তিন ঘণ্টা পর প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, কারণ সমুদ্রের পানির উচ্চতায় কোনো বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে সতর্কবার্তা জারির পর প্রায় ২,০০০ মানুষ মোটরসাইকেল ও অন্যান্য উপায়ে নিরাপদ স্থানে বা পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন। সিকা প্রদেশের উপকূলীয় গ্রাম তালিবুরার বাসিন্দারা আফটারশকের ভয়ে ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না এবং খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
ভূমিকম্পের তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে উৎপত্তিস্থলের পশ্চিমে অবস্থিত রুতেং শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ইউলিয়ান জুইতা একালিয়া বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, "আমি কখনোই এত বড় ভূমিকম্প অনুভব করিনি। মনে হচ্ছিল আমরা কোনো ট্রাম্পোলিনের ওপর আছি, এটি অত্যন্ত ভীতিকর ছিল।" ভূমিকম্পের আশঙ্কায় তিনি তার রান্নার চুলা বাইরে নিয়ে এসে রান্না করছেন।
মাউমেরে বন্দরে ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, টার্মিনাল ভবনের কংক্রিটের বড় বড় অংশ ভেঙে যাত্রীদের ওপর পড়ছে, যারা লঞ্চ বা ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। একটি জাহাজের গ্যাংওয়ে বা ওঠার সিঁড়ি ভেঙে পড়ায় কয়েকজন যাত্রী সাগরে পড়ে যান। দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে আরও সময় লাগবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ভূমিকম্পে ৫৪টি বাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া পাঁচটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, তিনটি উপাসনালয়, sechsটি সরকারি ভবন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি গুদামঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঙ্গারাই প্রদেশটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি বলে জানিয়েছে বিএনপিবি। সংস্থাটি জানিয়েছে, সিকা প্রদেশে ৩ জন, মাঙ্গারাই প্রদেশে ৬ জন এবং পূর্ব মাঙ্গারাই প্রদেশে ৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত ২ জন গুরুতর এবং ১১ জন সামান্য আহত হয়েছেন। বিএনপিবি জনগণকে শান্ত থাকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও উপকূলীয় এলাকা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির তৎপরতা দেখা যায়।






























