২০২০ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার থেকে নাটকীয়ভাবে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করার পর ক্যালিফোর্নিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিলেন প্রিন্স হ্যারি ও মেঘান মার্কেল। উইন্ডসর প্রাসাদের বাইরে তাদের নতুন জীবনের লক্ষ্য বেশ স্পষ্ট বলেই মনে হয়েছিল। তবে সম্প্রতি মেঘান মার্কেলের অভিনয়ে ফেরার গুঞ্জন এবং হ্যারির যুক্তরাজ্যে ফেরার আকুলতা তাদের ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা মার্কিন স্বপ্নের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রিন্স হ্যারির জন্য নিজের জন্মভূমি যুক্তরাজ্যে ফেরার টান বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট। গত বছর গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে তিনি স্বদেশের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছেন। হ্যারি বলেছিলেন, “আমি সব সময়ই যুক্তরাজ্যকে ভালোবেসেছি এবং বাসব। নিজের পছন্দের কাজগুলোর সঙ্গে আবারও যুক্ত হতে পারাটা দারুণ ব্যাপার। অনেক দিন ধরে যাদের চিনি, তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পেরেছি। দূর থেকে এটি করা কঠিন।” সম্প্রতি তার বাবা রাজা চার্লসের অসুস্থতা এবং কাজের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা হ্যারির দেশে ফেরার ইচ্ছাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কাজের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছর প্রমাণ করেছে যে, সাসেক্স ব্র্যান্ডের কেবল একটি দিকই বাণিজ্যিকভাবে সফল: রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গল্প। তবে কেবল নামের জোরে লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড বা দাতব্য উদ্যোগ চালু করে এই তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোযোগের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করা কঠিন।
মার্কিন গণমাধ্যমের সাবেক নির্বাহী ও বিশ্লেষক ইভান শাপিরো বলেন, “সাসেক্স দম্পতি যেন গণমাধ্যমের এক অদ্ভুত রূপান্তরের মুখে পড়েছেন। শুধু বিখ্যাত হওয়াই এখন আর যথেষ্ট নয়। মেঘান যখন শেষবার শোবিজ তথা বিনোদন জগতে [আইনবিষয়ক মার্কিন ড্রামা ‘সুটস’-এ] কাজ করেছিলেন, তখনকার যুগ আর এখনকার যুগ এক নয়। এখন প্রতিযোগিতা অনেক বেশি কঠিন। কারণ এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে আক্ষরিক অর্থেই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের সঙ্গে। ফোন হাতে থাকা আটশো কোটি মানুষ এখন মেঘান মার্কেলের প্রতিদ্বন্দ্বী।”
নেটফ্লিক্সের সঙ্গে চুক্তি করার পর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল রাজপরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের গল্পটি। ২০২২ সালের ‘হ্যারি অ্যান্ড মেঘান’ ডকুমেন্টারি সিরিজটি বিপুল সাড়া ফেলে এবং নেটফ্লিক্সের ইতিহাসে অন্যতম সফল ডকুমেন্টারি হিসেবে রেকর্ড গড়ে। তবে রাজকীয় বিতর্কহীন তাদের অন্যান্য প্রজেক্টগুলো সেই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি। হ্যারির পোলো বিষয়ক ডকুমেন্টারি নেটফ্লিক্সের শীর্ষ ১০-এর তালিকায় জায়গা পায়নি। মেঘানের কুকিং ও লাইফস্টাইল শো ‘উইথ লাভ, মেঘান’-এর দ্বিতীয় সিজনের দর্শকপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়; গত বছরের শেষার্ধে এটি নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা তালিকার ১,২১৭তম অবস্থানে নেমে আসে। এছাড়া তাদের একটি অ্যানিমেটেড শিশুতোষ সিরিজ ‘পার্ল’ বাতিল করা হয়েছে।
মেঘান পরবর্তীতে ২০২৫ সালে লেমোনাডা মিডিয়ার সঙ্গে ‘কনফেশনস অব আ ফিমেল Founder’ নামে একটি পডকাস্ট সিরিজ চালু করেন। তবে মাত্র ৯টি পর্ব প্রচারের পর তিনি জানান যে এর দ্বিতীয় কোনো সিজন আসবে না এবং তিনি তার অন্য প্রজেক্ট ‘অ্যাস এভার’-এ মনোযোগ দিচ্ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়া কনসালট্যান্ট ম্যাট নাভারা বলেন, “এমন নয় যে মানুষ এই দম্পতির প্রতি আগ্রহী নয়। বরং বিষয়টি উল্টো। তারা চাইলেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারেন। কিন্তু কঠিন কাজ হলো সেই মনোযোগকে একটি টেকসই মিডিয়া ব্যবসায় রূপান্তর করা। নতুন মিডিয়া জগতের একটি নির্মম শিক্ষা হলো—খ্যাতি আপনাকে প্রথম ক্লিক এনে দিতে পারে, কিন্তু কনটেন্টের গুণমানই দ্বিতীয় ক্লিকটি নিশ্চিত করে। তাদের প্রথম সিরিজটি ব্লকবাস্টার ছিল, কিন্তু তারা ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।”
এই পরিস্থিতিতে মেঘান মার্কেল আবারও তার পুরোনো পেশা অর্থাৎ অভিনয়ে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ভ্যানিটি ফেয়ারের সাবেক সম্পাদক টিনা ব্রাউন লিখেছেন, গত মাসে ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ রিয়েলিটি শোতে অতিথি বিচারক হিসেবে অংশ নেওয়ার পর মেঘান বুঝতে পেরেছেন যে অন্যের তৈরি কোনো সফল প্রজেক্টে অভিনয় করা কতটা সহজ এবং আনন্দের। ভ্যারাইটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় সিরিজ ‘দ্য জেন্টলম্যান’-এর তৃতীয় সিজনে অভিনয়ের জন্য নির্মাতা গাই রিচির সঙ্গে আলোচনা করছেন মেঘান। সাসেক্স দম্পতির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো এই খবর অস্বীকার করেনি।
তবে এই দম্পতি মিডিয়া প্রোডাকশন থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছেন না। তাদের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘আর্চওয়েল’ এখন একটি প্রথাগত প্রোডাকশন হাউজে রূপ নিয়েছে। নেটফ্লিক্সের জন্য তাদের আসন্ন প্রজেক্টগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি পোলো ড্রামা এবং রোমান্টিক উপন্যাস ‘মিট মি অ্যাট দ্য লেক’-এর চলচ্চিত্র রূপান্তর। এছাড়া নেটফ্লিক্সের বাইরেও তাদের কিছু প্রজেক্টের কাজ চলছে। যুক্তরাজ্যে ফিরে এলেও তাদের এই মিডিয়া কার্যক্রমে কোনো সমস্যা হবে না, কারণ যুক্তরাজ্য নিজেই বিনোদন জগতের একটি বড় হাব।
এদিকে হ্যারির আত্মজীবনী ‘স্পেয়ার’-এর মতো বিপুল সাফল্য পুনরায় অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তিনি বর্তমানে আগামী বছর বার্মিংহামে অনুষ্ঠিতব্য তার ‘ইনভিক্টাস গেমস’ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে মেঘান তার পডকাস্ট বন্ধ রাখার বিষয়ে বলেছিলেন, “আমি যখন আমার উদ্যোক্তা জীবনের অন্য একটি পর্যায়ে পৌঁছাব, তখন এই শোটি আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। ভিন্ন একটি সময়ের সঙ্গে তুলনা ও বৈসাদৃশ্য খোঁজাটা দারুণ রোমাঞ্চকর হবে।”






























