ইয়েমেনের হাদরামাউত ও মারিব প্রদেশের সরকারি সামরিক ক্যাম্পগুলোতে হুথি বিদ্রোহীদের চালানো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৩০ জন সেনা নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় আরও ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে সরকারি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে আল জাজিরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে এটি অন্যতম প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাদের এই হামলায় সরকারি বাহিনীর “শত শত” সদস্য হতাহত হয়েছে। ইয়েমেনি সামরিক বাহিনী হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে, এটি তাদের পাল্টা অভিযানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে চালানো হয়েছে। সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, মারিবের উত্তরে আল-জাওফ প্রদেশ থেকে আটটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যা হাদরামাউতের আল-থিনিয়া ও আল-আবর এবং মারিবের আল-রুক এলাকায় আঘাত হানে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আল জাজিরার ইয়েমেন বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আল-শালাফি জানান, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় (১১:০০ জিএমটি) এই হামলা চালানো হয়। এতে হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস, ইমার্জেন্সি ফোর্সেস এবং হাদরামাউতের ফার্স্ট মিলিটারি রিজিয়নের ক্যাম্পগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইমার্জেন্সি ফোর্সেসের কমান্ড জানিয়েছে, সকালে প্রশিক্ষণ মহড়ার জন্য সৈন্যরা জড়ো হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেশি হয়েছে।
২০২২ সালে সৌদি আরবের সহায়তায় গঠিত হোমল্যান্ড শিল্ড ফোর্সেস মারিব-হাদরামাউত সীমান্ত ও সৌদি সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে রয়েছে। এছাড়া, ২০১৫ সালের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ডিক্রির মাধ্যমে গঠিত ইমার্জেন্সি ফোর্সেস আল-জাওফ ও হাদরামাউতের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। গত চার বছরের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পর সম্প্রতি ইরান সমর্থিত হুথি ও সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মার্কিন দূতাবাস এই হামলাকে “কাপুরুষোচিত” বলে নিন্দা জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বার্তায় তারা নিহত সেনাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, এই হামলা ইয়েমেনি জনগণের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের আরেকটি উদাহরণ। এদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, সীমান্ত শহর নাজরানে হুথিদের হামলায় এক নারী ও শিশুসহ ১১ জন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি একে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন।
হুথিরা জুলাই মাসে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে এবং লোহিত সাগরে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয় ২০১৪ সালে, যখন হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। পরের বছর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করলেও তারা হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
হুথি মুখপাত্র সারি দাবি করেছেন, সরকারি বাহিনীর সামরিক প্রস্তুতির জবাবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি সরকারি বাহিনীর সদস্যদের সৌদি ক্যাম্প ত্যাগ করে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়েমেনের পরামর্শ ও পুনর্মিলন কর্তৃপক্ষের উপ-চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক আল-মেখলাফি এক্সে এক পোস্টে মন্তব্য করেছেন যে, হুথিরা যুদ্ধের প্রসার ঘটিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠন বাধাগ্রস্ত করতে চায়।
গত এক মাস ধরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় যখন হুথিরা জানায় যে একটি ইরানি বিমানকে সানা বিমানবন্দরে অবতরণে বাধা দেওয়া হয়েছে। ১৩ জুলাই ইয়েমেন সরকার জানায়, তারা সানা বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে যাতে আরেকটি ইরানি বিমান নামতে না পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় হুথিরা সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দরে হামলা চালায়। বর্তমানে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এই অঞ্চলের জ্বালানি রপ্তানি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
হুথিরা তাদের এই অবরোধকে ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় “সৌদি অবরোধের” পাল্টা জবাব হিসেবে দাবি করছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটও ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা শুরু করেছে।
সূত্র: আল জাজিরা




























