চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের এশীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক নীতি পরিচালনায় বড় ধরনের রদবদল করেছে। মঙ্গোলিয়ায় নিযুক্ত চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত শেন মিনজুয়ানকে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া বিভাগের নতুন মহাপরিচালক (ডিরেক্টর-জেনারেল) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। গত ২৯ জুলাই মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল তালিকায় এই পরিবর্তন নিশ্চিত করা হয়। তিনি বিদায়ী মহাপরিচালক লিউ জিনসংয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। এর আগে, গত ২১ জুলাই মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট খুরেলসুখ উখনা ২০২৩ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা শেন মিনজুয়ানকে সে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘অর্ডার অব দ্য পোলার স্টার’ (আলতান গেরেগে) প্রদান করেন।
বেইজিংয়ের এই সিদ্ধান্তকে তাদের আঞ্চলিক কূটনৈতিক কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে চীনের তথাকথিত ‘উলফ ওয়ারিয়র’ বা আক্রমণাত্মক কূটনীতি এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে তেমন ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। বরং এই কঠোর অবস্থানের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে তার আঞ্চলিক মিত্রদের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে এবং ছোট দেশগুলোর জন্য ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণত প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পর পর চীনের এই আঞ্চলিক কূটনীতিতে কঠোর ও সহযোগিতাপূর্ণ অবস্থানের চক্র লক্ষ্য করা যায়। ২০১৩ সালের ‘নেইবারহুড ডিপ্লোম্যাসি ওয়ার্ক কনফারেন্স’ এবং ২০১৮ ও ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার পর এমন পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল।
২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এশিয়া বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন লিউ জিনসং। জাপান, ভারত, আফগানিস্তান ও যুক্তরাজ্যে দায়িত্ব পালন করা এই পেশাদার কূটনীতিকের অবস্থান ছিল বেশ কঠোর। তার মেয়াদকালে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনমনীয় অবস্থান ও আক্রমণাত্মক বার্তা দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এর একটি বড় উদাহরণ ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাপানের এশীয় ও ওশেনীয় বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক কানাই মাসাাকির সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে তাইওয়ান সংকটকে জাপানের জন্য অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে উল্লেখ করার পর লিউ তীব্র প্রতিবাদ জানান। সেই বৈঠকের একটি ছবিতে দেখা যায়, লিউ প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে জাপানি প্রতিনিধির দিকে তাকিয়ে আছেন। ছবিটি আঞ্চলিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বেইজিংয়ের আধিপত্য বিস্তারের মনোভাব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, লিউকে এবার অস্ট্রেলিয়ায় চীনের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হতে পারে, যেখানে এই ধরনের কঠোর মনোভাব বেইজিংয়ের স্বার্থ রক্ষায় কাজে লাগতে পারে।
তবে চীনের নিকটতম প্রতিবেশী দেশগুলোর ক্ষেত্রে, যেখানে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা অত্যন্ত গভীর, সেখানে ভিন্ন কৌশলের প্রয়োজন ছিল। শেন মিনজুয়ান মঙ্গোলিয়ায় তার দায়িত্ব পালনকালে কোনো প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছিলেন। তার মেয়াদকালেই দীর্ঘ দুই দশক ধরে ঝুলে থাকা খনিজ রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘গাশুয়ান সুখাইত-গান্তস মোদ’ আন্তঃসীমান্ত রেলপথের নির্মাণকাজ শুরু হয়, যা ২০২৭ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ২০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পথে রয়েছে। ডর্নোগোবি প্রদেশের আলতানশিরি সোমে মঙ্গোলিয়ার প্রথম নিজস্ব শোধনাগারে তেল সরবরাহের জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতা এগিয়ে গেছে। এমনকি মঙ্গোলিয়ায় তীব্র শীতকালীন দুর্যোগ ‘জুদ’-এর সময় মানবিক সহায়তা দিয়ে তিনি দেশটির সব রাজনৈতিক দলের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মঙ্গোলিয়াকে তার ‘তৃতীয় প্রতিবেশী’ নীতি ত্যাগ করতে বা কোনো এক পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করেননি শেন।
তবে মঙ্গোলিয়ার এই সফল মডেল চীনের পুরো এশীয় অঞ্চলে প্রয়োগ করা শেনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। মঙ্গোলিয়ার সাথে চীনের একটি দীর্ঘ ও শান্তিপূর্ণ সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটির অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে চীনের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগর, পূর্ব চীন সাগর বা ভারত-চীন সীমান্তের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দক্ষিণ চীন সাগরে ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র প্রশাসনের সাথে চীনের ক্রমাগত উত্তেজনা চলছে, যেখানে ফিলিপাইনকে সমর্থন দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ নৌবাহিনী। জাপানের প্রতিরক্ষা খাতের সম্প্রসারণ ও নতুন নিরাপত্তা জোটের কারণে টোকিও-বেইজিং সম্পর্ক প্রায় জমে গেছে। ভারতের সাথে সীমান্ত বিরোধের জেরে নয়াদিল্লি ‘কোয়াড’ জোটের সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ও রাশিয়ার সাথে পিয়ংইয়ংয়ের ঘনিষ্ঠতা কোরীয় উপদ্বীপে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ সীমিত করে দিচ্ছে।
এছাড়া চীনের অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদী জনমত এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় করাও শেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সর্বোপরি, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপট অপরিবর্তিতই থাকছে। ফলে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে চীনের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই রদবদল নীতিগত কোনো আমূল পরিবর্তন আনবে না, তবে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক দক্ষতা ও কৌশলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। মঙ্গোলিয়ার জন্য এই পরিবর্তন সতর্ক আশাবাদের সুযোগ তৈরি করেছে। বেইজিং এখন উলানবাটরে পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাকে নিয়োগ দেয়, তার ওপর নির্ভর করছে এই নতুন কূটনৈতিক ধারা কতটা বাস্তবায়িত হবে।






























