প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে দেশজুড়ে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর সূত্র মতে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে গড়ে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। কিছু কিছু এলাকায় দিনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। ঢাকার বাইরে কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার চলে গেলে কয়েক ঘণ্টায়ও তা ফিরে আসছে না।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। এখানে সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে, যার ফলে মানুষের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের ইশোরকোল গ্রামের দিনমজুর আজগার আলী জানান, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে একফোঁটাও ঘুমাতে পারেন না। শরীর এত দুর্বল লাগে যে সকালে কাজে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। একদিন কাজে না গেলে ঘরে চাল ওঠে না, ফলে পরিবার নিয়ে তিনি চরম সংকটে পড়েছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের বিপাকে পড়েছেন। কাকিনা বাজারের ব্যবসায়ী মমিনুর রহমান লিটন জানান, ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ফ্রিজে রাখা আইসক্রিম, কোমল পানীয়সহ পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। এছাড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু শাহাদত সিয়াম জানায়, সামনে টেস্ট পরীক্ষা থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নিতে চরম সমস্যা হচ্ছে। কালীগঞ্জ নেসকো পিএলসির (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, উপজেলায় বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট।
ফেনীর দাগনভূঞায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকদের দিনে-রাতে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা, এমনকি কোথাও কোথাও ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছাড়া থাকতে হচ্ছে। এখানে সরকারি কোনো শিডিউল মানা হচ্ছে না। গ্রাহকদের অভিযোগ, অতিষ্ঠ হয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিস, উপকেন্দ্র বা অভিযোগ অফিসে ফোন করলেও কেউ রিসিভ করছেন না। অতিমাত্রার লোডশেডিংয়ের কারণে স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আরইবির ফেনী সমিতি জানিয়েছে, চাহিদার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় তারা সরকারি শিডিউল মানতে পারছেন না। সাধারণত ২-৩ ঘণ্টা লোডশেডিং হলেও এখন সাশ্রয়ের জন্য ১০-১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, যা গরম বাড়লে আরও ১-২ ঘণ্টা বেড়ে যায়।
মাদারীপুরেও দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে, যার কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকরা। বিদ্যুৎ সংকটে সেখানকার কারখানাগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। ওজোপাডিকোর (ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড) প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহকের জন্য ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ মিলছে মাত্র ১১ মেগাওয়াট। অন্যদিকে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪ লাখ ২৩ হাজার গ্রাহকের জন্য ১০৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৫২ মেগাওয়াট। কর্তৃপক্ষ ১৪টি সাবস্টেশনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে লোডশেডিং বণ্টন করছে। "রংয়ের ছোঁয়া প্রেস"-এর মালিক রুবেল মাতুব্বর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রেসের কোনো কাজই করা যাচ্ছে না, ফলে গ্রাহকরা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন এবং ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগও নিশ্চিত করে জানাতে পারছে না পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে।































