যারা হাসান মাহমুদকে খুব কাছ থেকে চেনেন, তারা তাকে একজন 'অপ্রত্যাশিত' ফাস্ট বোলার হিসেবেই জানেন। তবে এই বিশেষণটি তার বোলিং দক্ষতার জন্য নয়, বরং তার নম্র ব্যক্তিত্বের কারণে। লক্ষ্মীপুরে জন্ম নেওয়া ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ এতটাই বিনয়ী যে, উইকেট পাওয়ার পরও বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন না। তার ভয়, পাছে আউট হওয়া ব্যাটারটি মনে কষ্ট পেয়ে বসেন! অবশ্য উইকেট নেওয়ার আনন্দ বা তীব্র আকাঙ্ক্ষা কোনোটাই তার কম নয়।
নিজের আদর্শ ফাস্ট বোলারদের প্রতি হাসানের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অতুলনীয়। মাসকয়েক আগে ইংল্যান্ডের কাউন্টি দল কেন্টের হয়ে খেলার সময় ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন কিংবদন্তি জেমস অ্যান্ডারসন, যাকে ছোটবেলা থেকেই হাসান মনেপ্রাণে অনুসরণ করেন। কিন্তু পরম শ্রদ্ধেয় এই তারকার মুখোমুখি হয়েও লাজুক স্বভাবের কারণে তার সাথে কথা বলার সাহস সঞ্চয় করতে পারেননি হাসান।
বৃহস্পতিবার সকালে মারারা ওভালের চিত্রটি ছিল আরও চমৎকার। হাসান যখন নিজের run-up এর দাগ দিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই অস্ট্রেলীয় গতি তারকা মিচেল স্টার্ককেও একই কাজ করতে এগিয়ে আসতে দেখেন। অভিজ্ঞ এই পেসারের প্রতি সম্মান জানিয়ে হাসান অবলীলায় একপাশে সরে দাঁড়িয়ে তাকে জায়গা করে দেন। এই ছোট কিন্তু মিষ্টি মুহূর্তটি বুঝিয়ে দেয়, দীর্ঘ ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়ে কতটা কৃতজ্ঞ সফরকারীরা। সফরের শুরুতে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও বলেছিলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো অস্ট্রেলীয়দের সম্মান অর্জন করা, যাতে পরবর্তী টেস্ট সফরের জন্য আবারও দুই দশক অপেক্ষা করতে না হয়। শান্তর সেই বিশ্বাস ছিল, "আমরা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে পারি, তবে ভবিষ্যতে তারা অবশ্যই আমাদের আবারও আমন্ত্রণ জানাবে।"
ডারউইন টেস্টের প্রথম দিনে শান্তর সেই সাহসী বাঘেরা কেবল অস্ট্রেলিয়ার সম্মানই অর্জন করেনি, বরং তাদেরই ঘরের মাঠে ক্রিকেট খেলার এক দারুণ পাঠ দিয়েছে। বল ও ব্যাট—দুই বিভাগেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ক্রিকেট বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। আর প্যাট কামিন্সের শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এই দাপটের নেপথ্যে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম শান্ত স্বভাবের পেসার হাসান মাহমুদ।
গোটা দিনে বাংলাদেশের মূল শক্তি ছিল বল ও ব্যাটের শৃঙ্খলা। বছরের পর বছর ধরে অস্ট্রেলিয়া যেভাবে প্রতিপক্ষকে ঘরের মাঠে চেপে ধরে ক্লান্ত করে তোলে, ঠিক সেই একই কৌশলে এবার স্বাগতিকদেরই ঘায়েল করেছে বাংলাদেশ। পেস আক্রমণের নেতৃত্বে ছিলেন হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেন। হাসান খুব বেশি গতিতে বল করেন না, সাধারণত তার গতি থাকে ১৩০ কিলোমিটারের মাঝামাঝি, যা অনেকটা অস্ট্রেলীয় পেসার মাইকেল নেসারের মতো। তবে গতির ঘাটতি তিনি পুষিয়ে দেন নিখুঁত লেংথ আর উইকেটে বল ফেলে স্কিড করানোর সহজাত ক্ষমতা দিয়ে।
এই স্কিড করার ক্ষমতাই ভোগাল জেক ওয়েদারাল্ডকে। বেশ কয়েকবার পরাস্ত করার পর অবশেষে অফ-স্ট্যাম্পের বাইরের এক ডেলিভারিতে তাকে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন হাসান। এরপর রাউন্ড দ্য উইকেটে এসে দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে ট্রাভিস হেডকে বোল্ড করেন তিনি। দুই ব্যাটারই উইকেট কামড়ে ধরে ক্রিজে প্রায় এক ঘণ্টার বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। কোচ ফিল সিমন্সের অধীনে নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সেরাটা দেওয়ার যে পরিকল্পনা বাংলাদেশ করেছিল, হাসান যেন তারই সফল বাস্তবায়ন করলেন। তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাসকিন ও এবাদত।
বল হাতে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাটাররাও দেখিয়েছেন একই রকম ধৈর্য ও লড়াইয়ের মানসিকতা। তরুণ তানজিদ হাসান ও অভিজ্ঞ মুমিনুল হক স্টার্ক, কামিন্স ও হ্যাজেলউডের মতো বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের সামনে দারুণ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ডিফেন্সের পাশাপাশি সুযোগ বুঝে আক্রমণ করার যে ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল তারা দেখিয়েছেন, তাতেই খেই হারিয়েছে স্বাগতিকরা। এমনকি গত বছরের অ্যাডিলেড টেস্টের পর প্রথমবার বল করতে আসা নাথান লায়নকেও প্রথম স্পেলেই আক্রমণ করে রানের চাকা সচল রাখেন তারা। ডারউইনের এই ঐতিহাসিক দিনে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, সঠিক কৌশলের ব্যবহারে যেকোনো পরাশক্তিকেই তাদের নিজেদের মাঠে রুখে দেওয়া সম্ভব।



























