এসএসসি পরীক্ষা শুরুর মাত্র ২০ দিন আগে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সুমাইয়া খানম ইভানা (১৬)। রক্ত পরীক্ষায় তার হেপাটাইটিস–বি ধরা পড়ে। সঙ্গে ছিল জ্বর, ঘন ঘন বমি ও প্রচণ্ড দুর্বলতা। খাওয়াদাওয়াও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। গত ২১ এপ্রিল প্রথম পরীক্ষা দেওয়ার পর অসুস্থতা আরও বেড়ে গেলে তাকে চাঁদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২৩ এপ্রিল তাকে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে সে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন ছিল।
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার নবকলস গ্রামের প্রবাসী আমির খান ও গৃহিণী খাদিজা আক্তার দম্পতির মেয়ে সুমাইয়া খানম। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে সবার বড়। সে মতলবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। মেয়ের এমন গুরুতর অসুস্থতার খবর পেয়ে বিদেশে থাকা বাবা আমির খান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তবে চিকিৎসা ও পরীক্ষার পুরো সময়জুড়ে মেয়ের পাশে ছায়ার মতো ছিলেন মা খাদিজা আক্তার।
হাসপাতালের শয্যায় চিকিৎসাধীন থেকেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সুমাইয়া। প্রতিটি পরীক্ষার আগে চিকিৎসকের কাছ থেকে সাময়িক ছাড়পত্র নিয়ে অটোরিকশায় প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে গেছে। পরীক্ষা শেষ করে আবার ফিরেছে হাসপাতালের শয্যায়। পরীক্ষার সময় সুমাইয়ার শরীরে বিলিরুবিনের মাত্রা ১৩–এর বেশি ছিল। শারীরিক দুর্বলতার মধ্যেই হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে পড়াশোনা করেছে সে। সুমাইয়া বলে, ‘প্রতিটি পরীক্ষা শেষ করে আবার হাসপাতালে ফিরে যেতাম। শরীর খুব দুর্বল ছিল। তবু পরীক্ষা শেষ করার প্রবল ইচ্ছা ছিল।’
মেয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে একসময় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। মা খাদিজা আক্তার বলেন, ‘মেয়ের খুব ইচ্ছা ছিল পরীক্ষা দেওয়ার। ওর মানসিক শক্তির কারণেই অসুস্থ শরীরেও সব পরীক্ষা শেষ করেছে।’ ফলাফল প্রকাশের পর মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত খাদিজা আক্তার মেয়ের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। জিপিএ–৫ পাওয়ার পর নিজের মা–বাবা ও শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সুমাইয়া জানায়, ভবিষ্যতে সে একজন উদার দৃষ্টিভঙ্গির শিক্ষক হতে চায়, যে শিক্ষার্থীদের শুধু পড়াশোনা নয়, ভালো মানুষ হওয়ার পথও দেখাবে।
শারীরিক অসুস্থতা জয় করে সুমাইয়ার এই সাফল্যকে তার হার না মানা মানসিকতার পরিচয় বলে মন্তব্য করেন মতলবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম। তিনি জানান, এবার তাঁর বিদ্যালয় থেকে ২০৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়, যার মধ্যে ১৬৫ জন পাস করেছে এবং জিপিএ–৫ পেয়েছে ১৮ জন। বিদ্যালয়ের পাসের হার প্রায় ৮১ শতাংশ। মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কে এম ইশমাম বলেন, অসুস্থ শরীরে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে সুমাইয়ার জিপিএ–৫ পাওয়ার বিষয়টি তিনি জেনেছেন এবং তার এই সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সূত্র: প্রথম আলো





























