কম্বোডিয়ার কুখ্যাত খেমার রুজ আমলের এস-২১ নিরাপত্তা কারাগার থেকে বেঁচে যাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন বন্দির অন্যতম, চিত্রশিল্পী বু মেং ৮৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে খেমার রুজের নৃশংসতম অধ্যায়ের অন্যতম এক জীবন্ত সাক্ষী হারিয়ে গেল। কম্বোডিয়ার খেমার রুজ ট্রাইব্যুনাল (ইইসিসি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জনাব বু মেংয়ের প্রয়াণ খেমার রুজ আমলের ভয়াবহ অপরাধের, বিশেষ করে সাবেক এস-২১ নিরাপত্তা কেন্দ্রে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডির এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষীকে হারানোর শামিল।
১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে খেমার রুজ শাসিত ডেমোক্রেটিক কাম্পুচিয়ায় এস-২১ কারাগারে ১৪ হাজারেরও বেশি পুরুষ, নারী ও শিশুকে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ক্ষমতা দখলের পর খেমার রুজ একটি কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার উন্মাদনায় মেতে ওঠে। তারা প্রায় সব শহর ও নগর খালি করে মানুষকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শ্রম শিবিরে পাঠায়। তাদের ৩ বছর ৮ মাস ২০ দিনের শাসনামলে রোগবালাই, অনাহার ও মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে আনুমানিক ১৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
রাজধানী নমপেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলির একটি হাইস্কুলে গড়ে তোলা হয়েছিল এস-২১ বা তুওল স্লেং কারাগার। এটি ছিল খেমার রুজ বাহিনীর ভয়ংকর নির্যাতন কেন্দ্র। এখানে আনা প্রায় সব বন্দিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তিতে সই করানোর পর শহরের উপকণ্ঠে 'কিলিং ফিল্ডে' নিয়ে হত্যা করা হতো। প্রাপ্তবয়স্ক বন্দিদের মধ্যে মাত্র সাতজন এখান থেকে জীবিত ফিরতে পেরেছিলেন।
নিজের স্মৃতিকথা "বু মেং: এ সারভাইভার ফ্রম খেমার রুজ প্রিজন এস-২১"-এ তিনি লিখেছেন, ১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এস-২১ কারাগারে দুই বছর বন্দি রাখা হয়। ভ্যান নাথ নামের আরেক চিত্রশিল্পীর মতো বু মেংও কেবল তাঁর আঁকার দক্ষতার কারণে বেঁচে যান। তাঁকে খেমার রুজ নেতা "ব্রাদার নাম্বার ওয়ান" পল পট এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণামূলক প্রতিকৃতি আঁকার কাজে লাগানো হয়েছিল। তবে এই কাজ তাঁর স্ত্রী মা ইয়োইন ও দুই সন্তানকে বাঁচাতে পারেনি; তারা খেমার রুজের হাতে প্রাণ হারান।
২০০৯ সালে কারাগারের সাবেক প্রধান কাইং গুয়েক ইয়াভ ওরফে কমরেড ডাচের বিচারের সময় আদালতে সাক্ষ্য দেন বু মেং, ভ্যান নাথ এবং মেকানিক চুম মেয় (যিনি সেলাই মেশিন মেরামতের দক্ষতার কারণে বেঁচে যান)। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বু মেং তাঁর ওপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি জানান, বন্দিদের শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো এবং টয়লেট হিসেবে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হতো খালি বুলেটের বাক্স ও প্লাস্টিকের বোতল। আদালতে তিনি বলেছিলেন, "আমি প্রায় ২০ জন লম্বা চুলের মানুষকে দেখেছিলাম, যারা অত্যন্ত অসুস্থ ও কঙ্কালসার ছিলেন। সেই সেলটি ছিল পৃথিবীর বুকে এক নরক। আমি একটি টিকটিকি দেখে আশা করেছিলাম সেটি যেন আমার ওপর পড়ে, যাতে আমি সেটি ধরে খেতে পারি। তারা আমাকে চাবুক মারত আর জিজ্ঞেস করত আমি কখন সিআইএ-তে যোগ দিয়েছি।"
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে ভিয়েতনামী বাহিনী খেমার রুজ সরকারকে উৎখাত করে এস-২১ কারাগার মুক্ত করার আগ পর্যন্ত বু মেং সেখানে চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ করে যান। পরবর্তীতে ২০১০ সালের জুলাইয়ে ট্রাইব্যুনাল কমরেড ডাচকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ, হত্যা ও নির্যাতনের দায়ে ৩৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়। ২০১২ সালের শুরুতে সুপ্রিম কোর্ট সেই সাজা বাড়িয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে। ডাচ ২০২২ সালে ৭৭ বছর বয়সে মারা যান। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে, বু মেংয়ের সাক্ষ্য ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
জীবনের শেষ বছরগুলোতে বু মেংকে প্রায়ই সাবেক এস-২১ কারাগার, যা এখন তুওল স্লেং গণহত্যা জাদুঘর, সেখানে দেখা যেত। সেখানে তিনি তাঁর স্মৃতিকথা বিক্রি করতেন এবং দর্শনার্থীদের কাছে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতেন। বু মেংয়ের মৃত্যুর পর চুম মেয়-ই এখন এস-২১ কারাগারের একমাত্র জীবিত প্রাপ্তবয়স্ক উত্তরজীবী হিসেবে রয়ে গেলেন।
এই চিত্রশিল্পী ছিলেন ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের মধ্যে এস-২১ কারাগারে পাঠানো ১৪,০০০-এরও বেশি পুরুষ, নারী ও শিশুর একজন – এবং সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন মানুষের অন্যতম।






























