প্রতিবছর দেশে ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। একদিকে কর্মসংস্থানের অভাব, অন্যদিকে কাজের উপযোগী দক্ষ জনবলের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। দেশে বর্তমানে মোট বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার, যার মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার। বেকারদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বা স্নাতক ডিগ্রিধারীর হার প্রায় ২৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণ বেকার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি তিনজন স্নাতক ডিগ্রিধারীর একজনই বেকার এবং তাদের চাকরি পাওয়ার অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। প্রায় ১৭ শতাংশ স্নাতক দুই বছরের বেশি সময় ধরে বেকার থাকছেন, আর ১৫ শতাংশের বেশি উচ্চশিক্ষিত তরুণকে এক থেকে দুই বছরের বেশি চাকরির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যমতে, বিডিজবস ডটকমে বর্তমানে ৫০ লাখ চাকরিপ্রার্থীর প্রোফাইল রয়েছে, যা দুই বছর আগের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। বর্তমানে একটি শূন্য পদের বিপরীতে গড়ে ২৮৭ জন আবেদন করছেন, যেখানে কোভিড মহামারির আগের পাঁচ বছরে এই সংখ্যা ছিল ১৭৩ জন। অর্থাৎ প্রতিযোগিতার হার প্রায় ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিআইডিএস-এর গবেষণা পরিচালক অতনু রব্বানী মনে করেন, শুধু ঋণ সুবিধা দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়, কারণ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হারে বাড়ছে।
বিদেশের শ্রমবাজারেও একই ধরনের দক্ষতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের মাত্র ৪ শতাংশ পেশাজীবী এবং ২২ শতাংশ দক্ষ কর্মী ছিল, বাকি ৭৪ শতাংশই স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ। ২০২৪ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ পেশাজীবী ও ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ দক্ষ কর্মী, আর ২০২৩ সালে ছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ ও ২৪ শতাংশ। ভারত, নেপাল ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো কম খরচে দক্ষ শ্রমিক পাঠিয়ে বেশি আয় করলেও বাংলাদেশ সেই সুযোগ নিতে পারছে না।
সরকারি পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘অনগ্রসর ও হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন’ প্রকল্পে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত চার জেলায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ১৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নেওয়া ২ হাজার ৫৪৫ জনের মধ্যে মাত্র ২ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং কম্পিউটার ও আইটি প্রশিক্ষণ নেওয়া ২ হাজার ৬৪০ জনের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ চাকরি পেয়েছেন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রায় ৬০ শতাংশ কিছু আয় করতে পারলেও ৩৩ শতাংশ পুরোপুরি বেকার। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না; প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের সুযোগ, ঋণ সুবিধা এবং বাজারের সাথে সংযোগ নিশ্চিত করতে না পারলে এসব উদ্যোগ কেবল সার্টিফিকেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।





























