অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় প্রায় ১,২০০টি নতুন বসতি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের যেকোনো সম্ভাবনা চিরতরে নস্যাৎ করার লক্ষ্যেই কট্টরপন্থী ইসরায়েলি সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পূর্ব জেরুজালেমের পূর্বে অবস্থিত তথাকথিত 'ই-১' (E1) নামক এই এলাকায় আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনাটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দিত হয়ে আসছে। সমালোচকদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা পশ্চিম তীরকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলবে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের অন্যান্য অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেবে।
আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দরপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে পরবর্তীতে কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় এলেও এই দরপত্র বাতিল করা কঠিন হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ অবৈধ।
১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে প্রায় ১৬০টি বসতি গড়ে তুলেছে ইসরায়েল, যেখানে বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসবাস করছেন। এই অঞ্চলের পাশে প্রায় ৩৩ লাখ ফিলিস্তিনির বসবাস, যারা গাজা উপত্যকাসহ এই ভূখণ্ড নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন। তীব্র আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও একের পর এক ইসরায়েলি সরকার এই বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের শেষের দিকে কট্টর ডানপন্থী ও বসতি-পন্থী জোটের প্রধান হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধের মধ্যে এই সম্প্রসারণের গতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরায়েল কয়েক দশক ধরে 'ই-১' এলাকায় নির্মাণকাজ স্থগিত রেখেছিল। তবে বর্তমান সরকার এক বছর আগে এই এলাকায় নির্মাণের অনুমোদন দেয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে মুছে ফেলা। ওই এলাকায় বসবাসকারী বেদুইন ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি শান্তি গোষ্ঠীগুলো আদালতে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানালেও, দেশটির গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় গত আগস্টে অনুমোদিত ৩,৪০১টি আবাসন ইউনিটের মধ্যে ১,২৩৪টির জন্য দরপত্র জারি করেছে। এই প্রকল্পটি পূর্ব জেরুজালেম এবং মালে আদুমিম বসতির মধ্যবর্তী প্রায় ১২ বর্গকিলোমিটার (৪.৬ বর্গমাইল) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই পরিকল্পনা উন্মোচনের সময় ইসরায়েলের অতি-জাতীয়তাবাদী ও বসতি স্থাপনকারী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাটিকে "মুছে ফেলা হচ্ছে"।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জর্ডানের কাছ থেকে পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর দখল করে নেয় ইসরায়েল। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে তারা পূর্ব জেরুজালেমকে নিজেদের অংশ হিসেবে ঘোষণা করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশই স্বীকৃতি দেয়নি। 'ই-১' প্রকল্পের বিরোধীরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে বিচ্ছিন্ন করবে এবং রামাল্লাহ, পূর্ব জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে সংযোগকারী ফিলিস্তিনি নগর অঞ্চল গড়ে তোলার পথ বন্ধ করে দেবে।
ইসরায়েলি বসতি-বিরোধী পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'পিস নাও' (Peace Now) আদালতে এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, "নির্বাচনের আগে ঠিকাদারদের সাথে চুক্তি সই করার চেষ্টা করছে সরকার, যাতে পরবর্তী সরকারের পক্ষে এই নির্মাণকাজ বাতিল করা কঠিন হয়।" তারা আরও যোগ করে, এই পরিকল্পনার আংশিক বাস্তবায়নও উত্তর পশ্চিম তীরকে দক্ষিণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং পূর্ব জেরুজালেমকে একঘরে করে এই অঞ্চলের ভৌগোলিক ও কৌশলগত চরিত্রকে মৌলিকভাবে বদলে দেবে, যা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করবে।
জেরুজালেমে বসবাসরত 'স্টপ দ্য ওয়াল' ক্যাম্পেইনের ফিলিস্তিনি কর্মী জামাল জুমা এই প্রকল্পটিকে একটি বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিবিসির সাথে আলাপকালে তিনি বলেন, "এটি আমাদের সমাজ ও পরিবারগুলোকে ধ্বংস করে দেবে… এটি একটি বড় বিপর্যয়।" তিনি জানান, এর ফলে ৪০টিরও বেশি বেদুইন সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের উচ্ছেদ করা হবে।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, মহাসচিব এই নতুন দরপত্র আহ্বানের খবরে "গভীরভাবে উদ্বিগ্ন" এবং তিনি ইসরায়েলকে এই বিষয়ে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।































