কাজাখস্তানের কৌশলগত খনিজ খাতের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়ান রিসোর্সেস গ্রুপ (ইআরজি)-এর ওপর দেশটির সরকার তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছে। প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভের আমলে দেশটির ব্যবসায়িক অভিজাতদের নতুন করে সাজানোর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। গত মাসে কাজাখস্তানের সাংবিধানিক আদালত রায় দিয়েছে যে তোকায়েভ নতুন মৌলিক আইনের অধীনে আবারও প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে ২০২৯ সালে বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নির্বাচনে না দাঁড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি তোকায়েভ দিয়েছিলেন, তা এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
তোকায়েভ আবার নির্বাচনে লড়ুন বা না লড়ুন, কাজাখস্তানের নতুন নির্বাচনী চক্রের ঠিক আগে দেশটির ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভের আমলের 'অলিগার্কি' বা গুটি কয়েক ব্যবসায়ীর আধিপত্যের সমালোচনা করলেও, তোকায়েভের অধীনে তেলবহির্ভূত খাতের বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন আরও কম মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। গত বছরের দ্বিতীয় অর্ধেকের পর থেকে শুরু হওয়া বেশ কিছু মেগা চুক্তির মাধ্যমে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে, নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা আগের নাজারবায়েভ-অনুগামী অলিগার্কদের চেয়ে বর্তমান সরকারের সঙ্গে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছেন।
এই পরিবর্তনের অন্যতম বড় উদাহরণ লাক্সেমবার্গ-ভিত্তিক ইআরজি, যা কাজাখস্তানের জিডিপিতে প্রায় ২ থেকে ৪ শতাংশ অবদান রাখে। সম্প্রতি ৩৬ বছর বয়সী কুদরাত শামিয়েভকে ইআরজি-র কাজাখ শাখা ইউরেশিয়ান গ্রুপ এলএলপি-র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শামিয়েভ একই সঙ্গে কাজাখস্তানের সবচেয়ে বড় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান 'ইন্টেগ্রা কনস্ট্রাকশন কেজেড'-এর চেয়ারম্যান এবং দেশটির তায়কোয়ান্দো ফেডারেশনের প্রধান। সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা এক ভিডিওতে তাঁকে চীনের মতো 'রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী' ধাঁচে ব্যবসা পরিচালনার পক্ষে কথা বলতে দেখা গেছে। ভিডিওটিতে ব্যাকগ্রাউন্ডে ড্রেকের ২০২৩ সালের একটি গান বাজছিল। সেখানে শামিয়েভকে বলতে শোনা যায়, আমরা খনিজ সম্পদ নিই এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ করি। অন্য এক প্রতিনিধি যখন এটিকে 'চীনের মতো ব্যবস্থা' বলে উল্লেখ করেন, তখন শামিয়েভ সম্মতি দিয়ে বলেন, হ্যাঁ, এটি আমাদের জন্য এখন অনেক সহজ।
শামিয়েভ এখন যে প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করছেন, সেগুলো লোহা আকরিক, বক্সাইট, অ্যালুমিনা এবং ফেরোক্রোমের মতো বিশাল পরিমাণ শিল্প উপাদান উৎপাদন করে, যা বেইজিং এবং পশ্চিমাদের মধ্যে ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এছাড়া ইআরজি ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোবাল্টের একটি বড় উৎপাদক, যার সম্পদগুলো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে অবস্থিত। ইআরজি-তে শামিয়েভের এই নিয়োগ আসে যখন ইন্টেগ্রার মালিক এবং কাজাখস্তানের সর্বকনিষ্ঠ অলিগার্ক হিসেবে পরিচিত শাখমুরাত মুতালিপ গত মে মাসে এই খনিজ গোষ্ঠীর ৩৯.৩ শতাংশ শেয়ার কিনে নেন। শামিয়েভ ও মুতালিপ শৈশবের বন্ধু এবং তারা আলমাতির বাইরের একটি গ্রামের একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। মুতালিপের এই শেয়ার কেনার অর্থায়ন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পাওয়া রুশ ব্যাংকগুলোর কাছে ইআরজি-র বিশাল ঋণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একসময় এই কোম্পানিটি সোভিয়েত-পরবর্তী তিন প্রভাবশালী অলিগার্ক—আলেকজান্ডার মাচকেভিচ, আলিজান ইব্রাগিমভ এবং পাতোখ চোদিয়েভের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ২০১৩ সালে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হওয়ার পর ইআরজি-তে কাজাখ সরকারের শেয়ার ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে দাঁড়ায়। তখন যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড অফিস (এসএফও) কোম্পানিটির বিরুদ্ধে এক দশকব্যাপী তদন্ত শুরু করেছিল, যা শেষ পর্যন্ত কোনো অভিযোগ ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের শেয়ার বাড়ার ফলে বোর্ডে দুজন প্রতিনিধি পাঠানোর অধিকার পায় আস্তানা। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট নাজারবায়েভের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে বোর্ডের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রতিষ্ঠাতাদের হাতেই। সমালোচকদের কাছে তারা ছিলেন কাজাখস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে বিপুল মুনাফা লুটে নেওয়া এক অভিজাত গোষ্ঠী।
প্রতিষ্ঠাতা তিনজনের মধ্যে এখন কেবল উজবেকিস্তানে জন্মগ্রহণকারী বেলজিয়ামের নাগরিক চোদিয়েভ জীবিত আছেন। তিনি এবং গত বছর মারা যাওয়া কিরগিজস্তানে জন্মগ্রহণকারী ইসরায়েলি নাগরিক মাচকেভিচের উত্তরাধিকারীরা তাদের যথাক্রমে ১৮.৬% এবং ২০.৭% শেয়ার মুতালিপের মালিকানাধীন 'নেচার এনার্জি সলিউশনস লিমিটেড'-এর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইব্রাগিমভ পরিবার তাদের শেয়ার বিক্রি করেনি। আলিজান ইব্রাগিমভের ছেলে শুখরাত ইব্রাগিমভ ২০২৪ সালে গ্রুপের চেয়ারম্যান হন। গত বছর শুখরাত কোম্পানির সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ার কেনার চেষ্টা করলেও মুতালিপের কারণে তা সফল হয়নি। বর্তমানে ইআরজি-র বোর্ড চার সদস্যে নেমে এসেছে, যেখানে প্রতিষ্ঠাতা ত্রয়ীর একমাত্র বংশধর হিসেবে রয়েছেন শুখরাত।
এদিকে, বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। গত মার্চে কাজাখস্তানের তৎকালীন প্রথম উপ-প্রধানমন্ত্রী রোমান স্ক্লিয়ার বোর্ডে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সেরিক ঝুমাঙ্গারিনের স্থলাভিষিক্ত হন। পরবর্তীতে মে মাসে স্ক্লিয়ার তোকায়েভের চিফ অব স্টাফ বা কার্যালয় প্রধানের দায়িত্ব পান, যা কাজাখ রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির পর সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদ। সাধারণত এই পদের কর্মকর্তাদের করপোরেট বোর্ডে দেখা যায় না। এই বিষয়ে কুদরাত শামিয়েভ, নেচার এনার্জি সলিউশনস লিমিটেড, ইআরজি এবং কাজাখ প্রেসিডেন্ট প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।



























