মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এখন বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এই লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর গত শনিবার তিনি রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে লিখিত সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরও করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁর নাম ঘোষণা করা হতে পারে। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে তাঁকে দলের মহাসচিব ও সংসদ সদস্য পদ ছাড়তে হবে। ফলে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের সমীকরণ নিয়ে দলটির ভেতরে-বাইরে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
বিএনপির একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, বড় কোনো রদবদল না হলে বর্তমান সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদই দলের পরবর্তী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হতে যাচ্ছেন। দলের জাতীয় কাউন্সিলের আগপর্যন্ত তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তবে রিজভী ছাড়াও এই পদের জন্য আরও তিন হেভিওয়েট নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তাঁরা হলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সমাজকল্যাণ ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। এই চার নেতাই সাবেক ছাত্রনেতা এবং জিয়া পরিবারের অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত। একই সঙ্গে তাঁরা দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছেও অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য।
দলের দ্বিতীয় শীর্ষ পদ মহাসচিবের ওপর বিএনপির পুরো সাংগঠনিক কাঠামো নির্ভর করে। বিভিন্ন মত ও গ্রুপকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার এই গুরুদায়িত্ব পালনে রুহুল কবির রিজভীর পাল্লাই আপাতত ভারী বলে মনে করছেন দলের অনেক নীতিনির্ধারক। রিজভী বর্তমানে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় থাকা, জেল-জুলুম সহ্য করা এবং দলের দুঃসময়ে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে ঝুঁকি নিয়ে মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করায় তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাঝে তাঁর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। দলের জন্য তাঁর এই ত্যাগের মূল্যায়ন চান সমর্থকরা।
এদিকে মহাসচিব পদের দৌড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামও বেশ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। দলের নীতিনির্ধারণে তাঁর গভীর প্রভাব এবং তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাঁকে আলোচনায় রেখেছে। দীর্ঘদিন গুম থাকার পর ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটানো এই নেতা আন্তর্জাতিক মহলেও সুপরিচিত। অন্যদিকে, কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নামও বিবেচনায় রয়েছে। দলের সংকটকালে সমমনা দলগুলোর সঙ্গে সমন্বয় ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকা এবং মাঠপর্যায়ে দক্ষ সংগঠক হিসেবে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের গ্রহণযোগ্যতাও কম নয়।
মহাসচিব পদের আলোচনা প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, এই পদ নিয়ে কী হচ্ছে তা তাঁর জানা নেই। তিনি জানান, দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য বজায় রেখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশেই সর্বদা নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যা এখনও অব্যাহত আছে। দল তাঁকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেই সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নীতিনির্ধারকরাই নেবেন।
বিএনপির দলীয় ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাতজন নেতা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম মহাসচিব ছিলেন অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এরপর পর্যায়ক্রমে মোস্তাফিজুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুস সালাম তালুকদার, আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন এবং সর্বশেষ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই দায়িত্ব পান। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুল প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চের পর দলের কোনো জাতীয় কাউন্সিল না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণে এখন তারেক রহমানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।




























