হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিরোধ নিরসনে আয়োজিত শান্তি আলোচনা বর্তমানে এক গভীর অচলাবস্থায় পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার পুনরায় দাবি করেছেন যে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ‘টোটাল কন্ট্রোল’ বা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন আগ্রাসন, ক্ষতিপূরণ এবং আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত তাদের শর্তগুলো পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে না।
ইরানের পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি (পিজিএসএ) বুধবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক বিবৃতিতে জানায়, ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের বারবার করা দাবি যে হরমুজ প্রণালী আর অবরুদ্ধ নেই, তা বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে পারে না।’ সংস্থাটি আরও জোর দিয়ে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধই রয়েছে এবং ইরানের শর্তগুলো মেনে নেওয়া না পর্যন্ত এটি খোলা হবে না।’ ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ দাবির বিপরীতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন; ইরানের অবরোধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল গত এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। বর্তমানে ইরানি বাহিনী তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজকে এই সরু প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দিচ্ছে না। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালী ও এর আশেপাশের ইরানি বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ বজায় রেখেছে। মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী পানামার পতাকাবাহী একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে, যা একটি ইরানি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল।
বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল ধরে গোয়েন্দা ব্যর্থতার কারণে ভুল হিসাব করে আসছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সাথে মিলে তেহরানে হামলা চালানোর সময়ও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের ভুল করেছিল। আরাগচি এক্সে দেওয়া পোস্টে ওয়াশিংটনের বর্তমান কর্মকাণ্ডকে ‘আরও বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘ভুয়া খবরের চেয়েও বিপজ্জনক হলো ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য।’
ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সহযোগী আধা-সামরিক বাহিনী বাসিজ অর্গানাইজেশনের কমান্ডার হোজ্জাতোল ইসলাম হোসেইন তায়েব পুনরায় দাবি করেছেন যে, প্রণালীটি ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, তিনি বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আজ আপনারা দেখছেন যে হরমুজ প্রণালী ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আমাদের দেশ সম্পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে তার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমেরিকানরা ইসলামি বিপ্লবের শক্তি দেখেছে।’
ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, তার প্রশাসন ইরানের কারণে গত ৫০ বছরের ক্ষতির জন্য অর্থ দাবি করবে। তিনি দাবি করেন, গত চার মাসে ইরানে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। তবে তেহরানের তথ্যমতে, জানুয়ারি মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে ৩,১১৭ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭,০০০ মৃত্যুর কথা জানিয়েছিল, যার মধ্যে ৬,৫০০ জনই ছিল বিক্ষোভকারী।
ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। এর পরিবর্তে তারা ওমানের সাথে আলোচনা করছে এবং ভবিষ্যতে ওমানের সাথে প্রণালীর ব্যবস্থাপনা ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য প্রণালীটি খোলা রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু জাহাজ থেকে মাশুল আদায় করা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মতপার্থক্যের কারণে সেই চুক্তি কার্যকর হয়নি।
বর্তমানে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে যাতে এই জটিলতা নিরসন করা যায়। মঙ্গলবার কাতার জানিয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যকার আলোচনা ‘উন্নত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমরা চাই হরমুজ প্রণালী যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় খুলে দেওয়া হোক।’
আলোচনাকারীরা এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন যা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু করার পাশাপাশি ইরান ও ওমানের নিরাপত্তা উদ্বেগগুলোকেও সমাধান করবে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের পরেও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কিছু শর্ত মেনে নিতে হতে পারে, কারণ অভ্যন্তরীণভাবে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানোর জন্য তাদের ওপর চাপ বাড়ছে।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা হলো আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। ইরান এমন একটি চুক্তির নিশ্চয়তা চায় যা দেশে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। বিশ্লেষক আসসিদি বলেন, ‘প্রথমত ইরান নিরাপত্তা নিশ্চয়তা খুঁজছে, যা একটি চুক্তির মাধ্যমে দেশে স্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করতে পারে।’
হরমুজ প্রণালীর বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদিকে মার্কিন নৌ-বাহিনীর উপস্থিতি এবং অন্যদিকে ইরানের কঠোর অবস্থান পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখার জন্য এই অচলাবস্থা নিরসন এখন সময়ের দাবি।
পরিশেষে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনো ঝুলে আছে। উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে অনড় থাকায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন ওমানের মধ্যস্থতার দিকে তাকিয়ে আছে।
সূত্র: আল জাজিরা




























