মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে লিবিয়ার অভ্যুত্থানের ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। এক সময়ের আফ্রিকার অন্যতম ধনী রাষ্ট্রটি গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই গৃহযুদ্ধ অবসানের মাধ্যমে দেশটিকে পুনরেকত্রীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এই প্রচেষ্টার সামনের সারিতে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যাদের লিবিয়ার তেল ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। কাতার, মিশর এবং তুরস্কও ‘ওয়ান লিবিয়া’ বা একক লিবিয়ার ধারণায় ফিরে আসার জন্য চাপ দিচ্ছে, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা দুই প্রতিদ্বন্দ্বী কর্তৃপক্ষের সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লিবিয়ার সংকটের প্রেক্ষাপট
২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় বেনগাজিতে গাদ্দাফির চার দশকের একচ্ছত্র শাসনের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভ দমনে গাদ্দাফির কঠোর অবস্থান সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্ম দেয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশনের ভিত্তিতে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স—একটি আন্তর্জাতিক সামরিক হস্তক্ষেপ পরিচালনা করে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং নো-ফ্লাই জোন নিশ্চিত করা। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের অক্টোবরে গাদ্দাফি নিহত হন, যার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শুরু হওয়া তার ৪২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
বিভক্ত প্রশাসন ও বর্তমান পরিস্থিতি
গাদ্দাফির মৃত্যুর পর লিবিয়ায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয় এবং বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী আধিপত্য বিস্তারে লিপ্ত হয়। বর্তমানে দেশটি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনের অধীনে বিভক্ত
- ত্রিপোলিভিত্তিক ‘গভর্নমেন্ট অফ ন্যাশনাল ইউনিটি’ (GNU): এটি জাতিসংঘ স্বীকৃত এবং প্রধানমন্ত্রী আব্দুল হামিদ দীবাহর নেতৃত্বে পরিচালিত।
- পূর্বাঞ্চলীয় তবরুকভিত্তিক প্রশাসন: এটি খলিফা হাফতার এবং তার স্বঘোষিত ‘লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ (LNA) দ্বারা সমর্থিত।
জাতিসংঘ ২০২০ সালে ‘ইউএনএসএমআইএল’ (UNSMIL)-এর অধীনে আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা শুরু করে। এই রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা, নির্বাচন আয়োজন করা এবং জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসন করা। ২০২১ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র রিচার্ড নরল্যান্ডকে লিবিয়ার বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টা মাসাদ বুলুসের মাধ্যমে ওয়াশিংটন লিবিয়া পুনরেকত্রীকরণের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে।
মার্কিন প্রস্তাব ও ক্ষমতার ভাগাভাগি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগে একটি ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব রয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, আব্দুল হামিদ দীবাহ সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং খলিফা হাফতারের ছেলে, ৩৫ বছর বয়সী এলএনএ প্রধান সাদ্দাম হাফতার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবেন। ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, উভয় পক্ষ সহযোগিতা করলে লিবিয়ার বিশাল তেল ক্ষেত্রে মার্কিন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে উভয় কর্তৃপক্ষকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে চরম অর্থনৈতিক সংকটের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। যদিও ত্রিপোলি আন্তর্জাতিক বৈধতা পেয়েছে, তবে হাফতারের বাহিনী লিবিয়ার তেল ক্ষেত্র এবং টার্মিনালগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
২০২৬ সালের এপ্রিলে স্বাক্ষরিত লিবিয়ার ঐক্যবদ্ধ জাতীয় বাজেট এই মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকে ত্বরান্বিত করেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে প্রথম। কাতার, মিশর, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশ এই বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। গত মাসে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আঙ্কারায় সাদ্দাম হাফতারের সাথে বৈঠক করেছেন। সাদ্দাম হাফতার, যার পিতা খলিফা হাফতার ২০১১ সাল পর্যন্ত ভার্জিনিয়ায় বসবাস করতেন, জুলাই মাসে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাথে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে।
- ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য লিবিয়ার স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করার ক্ষেত্রে।
- তবে কিছু সমালোচক বলছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই পরিকল্পনায় সাধারণ লিবীয় জনগণের মতামতের অভাব রয়েছে।
- অনেকের মতে, এই চুক্তি রাজনৈতিক রাজবংশগুলোর ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
- কাতার, মিশর এবং তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো ‘লিবিয়া-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের দিকে পরিচালিত করবে।
পরিশেষে, লিবিয়ার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো মার্কিন প্রস্তাবিত এই ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামো গ্রহণ করবে কি না তার ওপর। অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে লিবিয়ার রাজনৈতিক দলগুলো শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হতে পারে কি না, তা দেখার অপেক্ষায় বিশ্ববাসী।
সূত্র: আল জাজিরা





























