কলোরাডো নদীর তীব্র পানি সংকট মোকাবিলায় অবশেষে ১০ বছরের একটি নতুন খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে মার্কিন ফেডারেল সরকার। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও একের পর এক ডেডলাইন পার হওয়ার পর মার্কিন ব্যুরো অব রিক্লেমেশন এই প্রস্তাবনা সামনে এনেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিকল্পনাটি কেবল একটি সাময়িক উপশম মাত্র, যা মূল সংকট পুরোপুরি দূর করতে পারবে না।
নতুন এই ফেডারেল রূপরেখা অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা ও নেভাদাকে যৌথভাবে প্রতি বছর ৩০ লাখ একর-ফুট পর্যন্ত পানি ব্যবহার কমাতে হতে পারে, যা তাদের মোট সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। এক একর-ফুট পানি বলতে বোঝায় একটি ফুটবল মাঠকে এক ফুট গভীর পানিতে ভিজিয়ে রাখতে যতটুকু পানি প্রয়োজন (প্রায় ৩ লাখ ২৬ হাজার গ্যালন বা ১২ লাখ লিটার), যা সাধারণত তিনটি পরিবারের এক বছরের পানির চাহিদা মেটাতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো এই পানিসম্পদ ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থলে থাকা অবকাঠামোগুলোকে রক্ষা করা। একই সঙ্গে কলোরাডো নদীর অববাহিকার সাতটি অঙ্গরাজ্যকে নিজেদের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আরও কিছু সময় দেওয়া। গত তিন বছর ধরে আপার-বেসিন (কলোরাডো, নিউ মেক্সিকো, ইউটা ও ওয়াইওমিং) এবং লোয়ার-বেসিন (ক্যালিফোর্নিয়া, অ্যারিজোনা ও নেভাদা) রাজ্যগুলো পানি ব্যবহারের বিপুল কাটছাঁট নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
উত্তর আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ এই কলোরাডো নদী রকি পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন হয়ে মেক্সিকো পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৪৫০ মাইল বা ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে। এই নদীটি সাতটি অঙ্গরাজ্য, ডজনখানেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং দুটি দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষের পানির প্রধান উৎস। পাশাপাশি এটি প্রায় ৫৫ লাখ একর কৃষিজমিতে সেচ দেয় এবং লস অ্যাঞ্জেলেস, ফিনিক্স ও লাস ভেগাসের মতো বড় বড় শহরের ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এই নদীর ওপর নির্ভরশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এছাড়া নদীটির দুটি প্রধান জলাধার—লেক মিড ও লেক পাওয়েল—লাখ লাখ মানুষের জলবিদ্যুতের চাহিদা মেটায়। এই অববাহিকাটি ১৫০টিরও বেশি বিপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
কলোরাডো নদীর পানি সংরক্ষণের বর্তমান চুক্তিটি ২০২৬ সালের অক্টোবরে শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু রাজ্যগুলোর মধ্যে বিরোধ কাটছে না। ১৯২২ সালের একটি চুক্তি অনুযায়ী আপার ও লোয়ার বেসিনের রাজ্যগুলোর মধ্যে সমানভাবে পানি ভাগ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে নদীটির গড় প্রবাহ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ কোটি একর-ফুট, অথচ বরাদ্দ দেওয়া অধিকারের পরিমাণ অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তুষার দ্রুত গলে বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে এবং শুষ্ক মাটি ও উদ্ভিদ বেশি পানি শুষে নিচ্ছে। ফলে ২০২০ সাল থেকে নদীর পানি প্রবাহ গত শতাব্দীর তুলনায় ৩২ শতাংশ কমে গেছে।
এই পানির ৭০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় কৃষিকাজে, বিশেষ করে গবাদি পশুর খাদ্য আলফালফা ও খড় এবং শীতকালীন শাকসবজি চাষে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, গ্রীষ্মের শুরুতে লেক পাওয়েলের পানির স্তর গ্লেন ক্যানিয়ন বাঁধের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সীমা থেকে মাত্র ৩৭ ফুট ওপরে ছিল। পানির স্তর আরও নিচে নেমে গেলে নদীপ্রবাহ বন্ধ হয়ে 'ডেডপুল' বা মৃত জলাধারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উটাহ স্টেট ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর কলোরাডো রিভার স্টাডিজের পরিচালক ড. জ্যাক শ্মিট সতর্ক করে বলেন, মাঝারি ধরনের খরা পরিস্থিতিও এই অঞ্চলকে খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে। এমনকি একটি অত্যন্ত ভালো বছরও এই সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্তি দিতে পারবে না। কলোরাডো ইউনিভার্সিটির জলবায়ু বিজ্ঞানী ব্র্যাড ইউডালও একমত যে, এল নিনোর মতো জলবায়ু পরিস্থিতি সাময়িক স্বস্তি দিলেও তা স্থায়ী সমাধান আনবে না।
মার্কিন ফেডারেল সরকারের রাজ্যগুলোর ওপর সরাসরি পানি কাটছাঁটের জোর খাটানোর ক্ষমতা সীমিত হলেও তারা লেক পাওয়েল ও লেক মিড নিয়ন্ত্রণ করে। এই নতুন পরিকল্পনায় পানি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহারকারীদের বিশেষ ক্রেডিট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ক্যালিফোর্নিয়া কলোরাডো রিভার বোর্ডের চেয়ারম্যান জেবি হ্যাম্বি বলেছেন, "এটি একটি সেতু, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাত্র তিনটি রাজ্য পুরো সাতটি রাজ্যের দায়িত্ব বহন করতে পারে না।" অ্যারিজোনার গভর্নর কেটি হবস এবং নেভাদার গভর্নর জো লম্বার্ডো ইতোমধ্যেই এই প্রস্তাবের কিছু অংশের বিরোধিতা করেছেন।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উটাহ কলোরাডো রিভার অথরিটির নির্বাহী পরিচালক অ্যামি হাস সতর্ক করেছেন যে, রাজ্যগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দশকের পর দশক ঝুলিয়ে রাখতে পারে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক রেট লারসন মনে করেন, আপার বেসিন তাদের পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারলে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরের মধ্যেই মামলা হতে পারে, যা সরাসরি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে যাবে। ইউসিএলএ-র পানি গবেষক নোয়াহ গ্যারিসন বলেন, শেষ পর্যন্ত সাতটি রাজ্যকেই পানি ব্যবহারের বড় ধরনের কাটছাঁটে একমত হতে হবে এবং পানি পুনর্ব্যবহারের মতো বিকল্প সমাধান খুঁজতে হবে। অন্যথায়, দুই বছরের মধ্যে পরিস্থিতি আবার আগের মতোই ভয়াবহ রূপ নেবে।






























