যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি বৃহস্পতিবার তেহরান সফর করবেন। ওয়াশিংটন কর্তৃক ইরানের বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর নতুন করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকির পর উভয় দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের প্রতিবেশী এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ হিসেবে কাতার দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে। গত জুন মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ক্ষেত্রেও দেশটির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি ও হরমোজ প্রণালীর সংকট
যুদ্ধের ষষ্ঠ মাস প্রায় শেষ হতে চললেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী কূটনৈতিক সমাধান আসেনি। বর্তমানে হরমোজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ চলছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী তার সফরে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করবেন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক্স (সাবেক টুইটার)-এ জানিয়েছেন, শেখ মোহাম্মদ হরমোজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির আগের স্থিতাবস্থায় ফিরে আসার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করবেন। এছাড়া উত্তেজনা প্রশমন ও আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরির উপায় নিয়েও ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবেন তিনি।
নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাব
- বৃহস্পতিবার ভোরে ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি জানিয়েছে, হরমোজ প্রণালীতে একটি ট্যাঙ্কারে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে আগুন ধরে যায়। তবে জাহাজের সকল ক্রু নিরাপদ আছেন।
- ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে সরবরাহ হতো। যুদ্ধের পর থেকে ইরান ও ওমানের মধ্যে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
- শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা অনুযায়ী, হরমোজ দিয়ে তেলের প্রবাহ তিন মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সোমবার মাত্র ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের আগে এই পরিমাণ ছিল দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল।
- আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের তথ্যমতে, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে হরমোজ প্রণালীতে ৭০টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৯ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
- ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড দাবি করেছে যে ওমানের সাথে তারা জলপথ ও রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে একমত হয়েছে, তবে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে বিস্তারিত আলোচনা এখনো চলমান।
- ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেন মোহেব্বি দাবি করেছিলেন যে উভয় পক্ষই নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্বের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে, তবে এই দাবি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড গত এক মাসে ইরানের ওপর কোনো হামলার খবর জানায়নি, যার ফলে যুদ্ধের ময়দানে আপাতত নীরবতা বিরাজ করছে। তবে ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ইরান ও লেবাননে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা এবং বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা। ইরান যদিও আকাশপথে হামলার কারণে কিছুটা দুর্বল হয়েছে, তবুও তারা এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালানোর মতো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক জলপথটি যুদ্ধের আগে উন্মুক্ত থাকলেও ইরান এখন এটিকে রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে, যার তীব্র বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। কাতারের প্রধানমন্ত্রীর এই সফর কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: গালফ টুডে































