উজবেকিস্তানে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় বা প্রেসিডেন্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এর কর্মকর্তাদের আজীবন দায়মুক্তি দিয়ে একটি নতুন সাংবিধানিক আইন পাস করা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনটি মূলত দেশটির প্রেসিডেন্ট শওকত মির্জিউয়েভের জ্যেষ্ঠ কন্যা সাইদা মির্জিউয়েভার ক্ষমতাকে সীমাহীন করার লক্ষ্যেই প্রণয়ন করা হয়েছে। সম্প্রতি ২০২৬ সালের আগস্টের শেষের দিকে চীন সফরে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন সাইদা। রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি শেরজোদ আসাদভ অবশ্য এই নতুন আইনটিকে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কাজের সমন্বয় সাধনে বিদ্যমান "আইনি শূন্যতা" দূর করার একটি উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে এই আইনটি পাস করা হয়। কোনো ধরনের জনমত যাচাই বা গণ-আলোচনা ছাড়াই গত ৬ আগস্ট আইনসভা বা লেজিসলেটিভ চেম্বার এটি পাস করে এবং পরের দিনই ৭ আগস্ট সিনেট এতে অনুমোদন দেয়। এমনকি গত ১৪ আগস্ট প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করার আগে পর্যন্ত আইনের খসড়া বা এর বিষয়বস্তু প্রকাশ করা হয়নি। ৪টি অধ্যায় এবং ৩৪টি ধারা সম্বলিত এই নতুন আইনটি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রধানের ক্ষমতাকে ব্যাপক বিস্তৃত করেছে। এই পদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মতো আইনসভার অনুমোদনের প্রয়োজন নেই, বরং প্রেসিডেন্ট নিজেই সরাসরি প্রশাসনিক প্রধানকে নিয়োগ ও বরখাস্ত করতে পারবেন।
২০১৬ সালে শওকত মির্জিউয়েভ ক্ষমতায় আসার দুই বছর পর, ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতির কার্যক্রমের তথ্য, বিশ্লেষণাত্মক, সাংগঠনিক ও তদারকি সহায়তার জন্য এই প্রশাসনিক কাঠামোটি চালু করা হয়েছিল। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এটি পরিচালনা করেন জয়নিলোবিদ্দিন নিজোমিদ্দিনভ এবং ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সরদোর উমুরজাকভ এর দায়িত্বে ছিলেন। এই সময়ে সাইদা মির্জিউয়েভও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯-২০২০ মেয়াদে তিনি তথ্য ও গণযোগাযোগ সংস্থার উপ-পরিচালক এবং ২০২০-২০২২ মেয়াদে জাতীয় গণমাধ্যম সহায়তা ও উন্নয়ন তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ডের সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের যোগাযোগ ও তথ্য নীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২৩ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপতির সহকারী নিযুক্ত হন। সে সময় উমুরজাকভকে অন্য দায়িত্বে সরিয়ে দিয়ে প্রশাসনিক প্রধানের পদটি বিলুপ্ত করা হয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের জুনে পদটি পুনরায় চালু করে সাইদাকে এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নতুন আইনের ৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এখন থেকে যেকোনো সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ ও দায়িত্ব প্রদান করতে পারবে। এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে এই প্রশাসনকে। এছাড়া, আইনের ১৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী আঞ্চলিক গভর্নর বা হাকিমদের ওপরও সাইদা মির্জিউয়েভার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রশাসন এখন থেকে রাষ্ট্রপতির সব আদেশ বাস্তবায়নের ওপর নজরদারি করবে, গভর্নর নিয়োগ ও বরখাস্তের আইনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে এবং আইন লঙ্ঘন বা অনুচিত আচরণের জন্য জেলা ও শহরের হাকিমদের বরখাস্ত করতে পারবে। এই সমস্ত কাজ পরিচালনার জন্য যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যভাণ্ডারে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়।
আইনটির ১৯ নম্বর ধারা বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো বিচারিক ক্ষমতা বা স্বাধীন জবাবদিহিতা না থাকা সত্ত্বেও এই প্রশাসন এখন থেকে বিচার বিভাগীয় সংস্কারের সমন্বয় সাধন এবং বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব তৈরি করবে। অন্যদিকে, ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী দুর্নীতিবিরোধী কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাও মির্জিউয়েভার নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তিনি প্রজাতন্ত্রের সব স্তরের সরকারি সংস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করবেন, যারা সরাসরি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের কাছে রিপোর্ট করবেন। এর ফলে নাগরিকদের এখন এমন একটি সরকারি সংস্থার কাছে দুর্নীতির অভিযোগ করতে হবে, যার নিজের কোনো জবাবদিহিতা নেই এবং যার কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের ফৌজদারি অভিযোগ, গ্রেপ্তার বা তদন্তের বিরুদ্ধে আজীবন আইনি দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এর বাইরেও, এই আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্রধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদ লাভ করবেন। নিরাপত্তা পরিষদের সচিবালয়ের মাধ্যমে তিনি সশস্ত্র বাহিনী, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতি সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা নিশ্চিত করার কর্তৃত্ব পাবেন। ফলে সাইদা এখন দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব খাটাতে পারবেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইনটি মূলত দুটি বড় বার্তা দিচ্ছে। প্রথমত, এটি রাষ্ট্রপতির মেয়ের সীমাহীন ও জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতাকে আইনি ভিত্তি দিল। দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাঁর কোনো ক্ষতি হলে এটি একটি বিকল্প সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে, সাইদাকে কেবল রাষ্ট্রপতির কন্যা হিসেবে নয়, বরং তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে প্রস্তুত করা হচ্ছে।




























