আজকের দিনে ফাস্ট ফ্যাশন বা দ্রুত পরিবর্তনশীল সস্তা পোশাকের রমরমা বাজার। ক্রপ টপ, শর্টস কিংবা বাহারি রঙের পোশাকের সিংহভাগই এই ফাস্ট ফ্যাশনেরই অবদান। তবে এই ট্রেন্ডকে এক অভিনব উপায়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন এক নারী। তিনি বাজার থেকে পোশাক না কিনে নিজের বাড়ির উঠানে বীজ বুনে তৈরি করছেন আস্ত একটি পোশাক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্টের বাসিন্দা ইভ অগডেন শব তাঁর বাড়ির উঠানে তিসি বা ফ্ল্যাক্স চাষ করছেন। এই ফ্ল্যাক্স থেকে লিনেন সুতা তৈরি করে নিজের জন্য একটি লিনেন পোশাক বানানোর এক দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প শুরু করেছেন তিনি। নিজের এই পুরো প্রক্রিয়াটির ভিডিও নিয়মিত তিনি তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে শেয়ার করছেন। এই প্রকল্প সম্পর্কে ইভ বলেন, আমার মাথায় এমন একটি চিন্তা এসেছিল যে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির ফ্যাশনের সন্ধান করতে চাই। আর তখনই আমার মনে হলো, আমি আমার বাড়ির উঠানে বীজ বুনে একটি পোশাক তৈরি করতে পারি।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ইভ তাঁর বাড়ির ৬০০ বর্গফুটের একটি সবজি বাগানকে ফ্ল্যাক্স চাষের জমিতে রূপান্তর করে এই প্রকল্পের সূচনা করেন। ইতিমধ্যে তিনি প্রথম ফসল কাটার পর দ্বিতীয়বারের মতো বীজ বুনে সেই ফসলও ঘরে তুলেছেন। এখন তিনি প্রাচীন উপায়ে এই উদ্ভিদ থেকে আঁশ বের করার প্রক্রিয়া শিখছেন, যা রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। এই জটিল কাজে তিনি মাঝে মাঝে তাঁর পরিবার ও বন্ধুদেরও সাহায্য নিচ্ছেন।
কাজের ধাপগুলো বর্ণনা করে ইভ বলেন, আমরা প্রথমে ফসলটিকে পচিয়েছি (রেটিং), যা এক ধরনের পচন প্রক্রিয়া। এরপর আঁশ ছাড়ানো (ব্রেকিং ও স্কচিং) এবং চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানোর (হ্যাকলিং) কাজ করতে হয়। এরপর সুতা কেটে তা পরিষ্কার করতে হয় এবং সবশেষে সুতা রঙ করতে হয়। তিনি এখনো সুতা রঙ করার ধাপে পৌঁছাননি, তবে সুতা রঙ করার জন্য ইতিমধ্যেই নিজের বাগানে নীল বা ইন্ডিগো গাছ লাগিয়েছেন।
তিসি থেকে লিনেন সুতা তৈরি হয়ে গেলে ইভ সেটি একটি বিশাল তাঁতে বুনবেন—ঠিক যেমনটি ওডিসিতে পেনেলোপি করেছিলেন। কাপড় বোনা শেষ হলে সেটি কেটে নিজের জন্য একটি পোশাক সেলাই করবেন। ইভ বলেন, এটি একটি বিশাল ও কঠিন কাজ। তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যখন এটি মানুষের কাছে অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয় ছিল। এই প্রকল্পের এই ঐতিহাসিক দিকটি আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় লেগেছে।
আজকের দিনে ঘরে বসে খুব সহজেই সস্তায় যেকোনো পোশাক অর্ডার করা যায়। কিন্তু এই ফাস্ট ফ্যাশন পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এই ব্যবস্থার কারণে একদিকে ঘানার মতো দেশগুলোতে কাপড়ের বিশাল আবর্জনার স্তূপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ভারতের রিসাইক্লিং কারখানাগুলোতে কাজ করা শ্রমিকেরা ফুসফুসের নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের বর্তমান সংস্কৃতিতে কোনো জিনিস সস্তায় ও দ্রুত করা গেলেই সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ইভ এই ব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রশ্ন তোলেন, আসলেই কি তা করা উচিত? আমরা যদি একটু ধীরগতির হই এবং এমন কিছু করার চেষ্টা করি যা আমাদের কাছে অর্থপূর্ণ, তবে আমরা কী অর্জন করতে পারি যা এই দ্রুতগতির বাণিজ্যিক বিশ্ব আমাদের দিতে পারে না?
ইভ মূলত সৃজনশীলতার মূল্য অন্বেষণ করতে চান এবং নিজে হাতে জিনিস তৈরি করার মাধ্যমে মানুষ কী ধরনের সুবিধা পেতে পারে তা খতিয়ে দেখতে চান। নিজেকে একজন ফাইবার-কর্মী ও নির্মাতা হিসেবে বর্ণনা করা ইভ এর আগেও এমন অনেক জীবনমুখী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি তাঁর পরিবারের এক বছর চিনি ছাড়া থাকার অভিজ্ঞতা এবং টানা ১২ মাস কোনো আবর্জনা তৈরি না করে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন।
আবর্জনা ছাড়া জীবনযাপনের সেই অভিজ্ঞতা তাঁর এই নতুন পোশাক তৈরির কাজেও সাহায্য করছে। কারণ, প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের শরীর ও পরিবেশের ক্ষতি করছে তা তিনি তখন বুঝতে পেরেছিলেন। ইভের মতে, দুর্ভাগ্যবশত আমরা না জেনেই বেশিরভাগ সময় প্লাস্টিকের ব্যাগ গায়ে জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। তিনি আশা করেন, তাঁর এই প্রকল্প আধুনিক পোশাক শিল্পের নেতিবাচক দিকগুলো, বিশেষ করে পোশাক শ্রমিকদের কম মজুরি ও খারাপ কর্মপরিবেশের বিষয়টির ওপর আলো ফেলবে।
মাটি থেকে পোশাক তৈরির এই যাত্রায় ইভ অসংখ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে কিছু কাজ রপ্ত করা অন্যদের চেয়ে বেশ কঠিন ছিল। সুতা কাটার চেষ্টা করার সময় বেশ কয়েকটি ভিডিওতে তাঁকে ক্যামেরার সামনে হতাশাজনক অভিব্যক্তি দিতে দেখা গেছে। তিনি হেসে বলেন, শেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের সহজাত হাস্যরস থাকে, কারণ আপনি বারবার ভুল করবেন এবং আপনি জানেন যে আপনি ভুল করতে যাচ্ছেন।
এই প্রকল্প অনেকের চোখ খুলে দিয়েছে বলে জানান ইভ। তিনি বলেন, আমার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে অনেকেই মন্তব্য করে বলছেন—তারা এখন বুঝতে পারছেন কেন আগে কাপড়ের এত দাম ছিল, কেন কাপড়কে এত মূল্যবান সম্পদ মনে করা হতো এবং মানুষ কেন মাত্র একটি বা দুটি পোশাকের মালিক হতো। কারণ এটি তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। এই কাজের পর ইভের নিজের চিন্তাভাবনাও বদলে গেছে। শপিং মলের কাপড়ের প্রতি তিনি আর আকর্ষণ বোধ করেন না এবং নিজের পুরোনো কাপড়গুলো মেরামত করে পরার প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়েছে।
পোশাকটি সেলাই করার বিষয়ে ইভ জানান, এর আগে তাঁর সেলাইয়ের অভিজ্ঞতা কেবল হ্যালোউইনের কস্টিউম তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে তিনি তাঁর এক অভিজ্ঞ বন্ধুর সহায়তায় ঐতিহাসিক পোশাকের প্যাটার্ন অনুসরণ করে লিনেন পোশাকটি ডিজাইন করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি বলেন, আমি বলতে পারছি না এই প্রকল্প ঠিক কবে শেষ হবে, তবে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে এর শেষে আমি নিজের তৈরি পোশাকটিই পরিধান করব। এটি যা-ই হোক না কেন, আমার কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম এবং আমি জানি এটি আমার কাছে অত্যন্ত সুন্দর হবে।































