ইউরোপজুড়ে অব্যাহত দাবদাহের ফলে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাইন নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে। গত সপ্তাহে পশ্চিম জার্মানির কোলন এবং জার্মানি-নেদারল্যান্ডস সীমান্তের লোবিথ পয়েন্টে পানির উচ্চতা রেকর্ড শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। শুধু রাইন নয়, দানিয়ুব ও ইতালির পো নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোও অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের খরা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে মধ্য-পশ্চিম ইউরোপে খরার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। আগামী অন্তত এক সপ্তাহ ইউরোপের অনেক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জার্মানির লো ওয়াটার ইনফরমেশন সিস্টেম (NIWIS) জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষে রাইন নদীর ৪৪ শতাংশ এবং দানিয়ুব নদীর ৭৮ শতাংশ পরিমাপক কেন্দ্রে পানির স্তর অত্যন্ত নিচে নেমে গেছে।
রাইন নদীর নৌ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কাউব (Kaub) পয়েন্টে পানির গভীরতা গত শুক্রবার ২০১৮ সালের রেকর্ড করা সর্বনিম্ন ২৫ সেন্টিমিটারে নেমে এসেছিল, যদিও সোমবার তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। রাইন ওয়াটারওয়েজ অ্যান্ড শিপিং অথরিটির মার্টিন ওলটারস জানিয়েছেন, নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও, কার্গো জাহাজের ওজন কমাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এর ফলে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং পণ্য সরবরাহে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
দানিয়ুব নদীর অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সার্বিয়া ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলোতে পানির স্তর গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সার্বিয়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর শীতলীকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস করা হয়েছে। রোমানিয়াতে চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পানি প্রবাহ বাড়াতে নদীর তীরে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর অপসারণ করতে হয়েছে। এছাড়া দাচিয়া ও ফোর্ডের মতো বড় গাড়ি কারখানাগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য উৎপাদন দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে।
ইতালির দীর্ঘতম নদী 'পো' ক্রেমোনা শহরের কাছে জুলাই মাসের শেষে ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। পুরো পো উপত্যকায় খরার সতর্কতা 'উচ্চ' পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে এবং পানীয় জলের সরবরাহ নিয়েও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। নদীর মোহনায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের নোনা পানি নদীগর্ভে প্রবেশ করছে, যা বাস্তুসংস্থান ও কৃষিকাজে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপের অনেক অংশে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকদের মতে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ তাপমাত্রায় বাষ্পীভবন বেড়ে যাওয়ায় খরার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে গৃহস্থালি, কৃষি ও শিল্পে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস ক্লাইমেট সার্ভিস জানিয়েছে, ২০২২ সালের খরা ইউরোপে দাবানলের প্রকোপ বাড়িয়েছিল, যা থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ হয়েছে।





























