কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক জেসন আরডে তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে জালিয়াতি এবং গবেষণাপত্রে চৌর্যবৃত্তি বা প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ ওঠার কয়েক সপ্তাহের মাথায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। সমাজবিজ্ঞানী আরডে ২০২৩ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজে যোগ দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
শৈশবে অটিজম ও ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত আরডে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না এবং ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পড়তে বা লিখতে জানতেন না—এমন এক অনুপ্রেরণাদায়ী জীবনসংগ্রামের গল্প প্রকাশ করে তিনি যুক্তরাজ্যের অন্যতম আলোচিত শিক্ষাবিদে পরিণত হন। তবে বুধবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "আমার ও আমার প্রিয়জনদের ওপর এই অবিরাম অভিযোগ, জল্পনা-কল্পনা এবং পাবলিক মন্তব্যের গভীর প্রভাব পড়েছে।" তবে তিনি সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাঁর পদত্যাগকে যেন কোনোভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বীকৃতি হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়। তিনি যোগ করেন, "সহ্য করার মতো মানবিক সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
এর আগে আরডে তাঁর শিক্ষায়তনিক কাজে যেকোনো ধরনের ইচ্ছাকৃত ভুলের কথা অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এসব ভুল অসচেতনভাবে হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী ও মতাদর্শগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ তোলেন নাথান কফনাস নামের একজন জীববিজ্ঞানের দার্শনিক এবং কেমব্রিজের সাবেক গবেষক। কফনাস অতীতে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং লিখেছিলেন যে, যোগ্যতাভিত্তিক সমাজে খেলাধুলা ও বিনোদন ছাড়া অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে কৃষ্ণাঙ্গদের দেখা যাবে না।
কফনাস জানান, কেমব্রিজের একজন শিক্ষাবিদ তাঁকে ফ্যাকাল্টিতে "একজন লেখা চোর ও মিথ্যাবাদী" থাকার কথা জানানোর পর তিনি আরডের পিএইচডি থিসিস ও বেশ কয়েকটি গবেষণাপত্র প্লেজিয়ারিজম যাচাইকরণ সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। সিবিএস নিউজকে তিনি বলেন, "আমি সেখানে ব্যাপক চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ পেয়েছি। অনেক জায়গায় কোনো ধরনের তথ্যসূত্র ছাড়াই অন্য গবেষকদের লেখা হুবহু বা সামান্য শব্দ পরিবর্তন করে কপি করা হয়েছে।" তবে আরডে যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছিলেন, সেই লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর ডক্টরাল থিসিস তদন্ত করে একাডেমিক অসদাচরণের কোনো প্রমাণ পায়নি বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য টাইমস অব লন্ডন'।
প্লেজিয়ারিজমের বাইরে আরডের ব্যক্তিগত জীবন ও অর্জন নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন কফনাস, যদিও তিনি স্বীকার করেছেন যে সরাসরি প্রমাণ ছাড়া আরডের জীবনবৃত্তান্তের দাবিগুলো প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা অসম্ভব। তবে অন্যান্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাঁর বিভিন্ন দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। 'দ্য টাইমস অব লন্ডন' জানিয়েছে, আরডে বিভিন্ন শারীরিক সক্ষমতার চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে দাতব্য তহবিলের জন্য লাখ লাখ পাউন্ড সংগ্রহের দাবি করলেও পরবর্তীতে তাঁর গল্পের বিবরণ পরিবর্তন করেন। 'দ্য টেলিগ্রাফ' তাঁর বই প্রকাশের দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ খুঁজে পায়নি। এছাড়া 'দ্য গার্ডিয়ান' জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে মুখোশধারী ব্যক্তির ছুরি নিয়ে দুইবার হামলাসহ একাধিক অপরাধের শিকার হওয়ার যে দাবি আরডে করেছিলেন, তার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
আরডের সমর্থকরা মনে করেন, এই সমালোচনা সাধারণ একাডেমিক পর্যালোচনার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। জাতি, বৈষম্য ও বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করার কারণে তাঁকে নিশানা করা হয়েছে। আইনি সহায়তা সংস্থা 'দ্য গুড ল' প্রজেক্ট' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছে, "ডানপন্থী পত্রিকাগুলো মিথ্যা প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ এনে তাঁর সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করছে।" অন্যদিকে সমালোচকদের দাবি, এই ঘটনা উচ্চশিক্ষায় মেধা, একাডেমিক মান এবং ডিইআই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। অনেকের মতে, বর্ণবাদী হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার ভয়ে এতদিন এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হয়নি। সিবিএস নিউজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও আরডে বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।





























