শুক্রবার মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিন আল্লাহ মুমিনদের মসজিদে সমবেত হয়ে খুতবা শোনা এবং নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। জুমার খুতবা মুসলমানদের ইমান, আমল, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনের দিকনির্দেশনা প্রদানকারী গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বর্তমান সময়ে অনেক মসজিদে খুতবা চলাকালীন দানবাক্স বা ব্যাগ ঘুরিয়ে টাকা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো, খুতবা চলাকালীন এভাবে টাকা ওঠানো শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ? এ বিষয়ে কোরআন, সুন্নাহ ও ফকিহদের বক্তব্য কী? বিষয়টি জানা প্রত্যেক মুসল্লি ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির জন্য অতীব জরুরি।
জুমার খুতবা সম্পর্কে আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘হে ইমানদারগণ, জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা জুমুআ, আয়াত: ৯)। এ আয়াতে ‘আল্লাহর স্মরণ’ বলতে জুমার খুতবা ও নামাজ উভয়ই উদ্দেশ্য। তাই আজান হওয়ার পর দুনিয়াবি কাজ ছেড়ে খুতবার প্রতি মনোযোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখান থেকেই বোঝা যায়, খুতবা একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যার প্রতি মনোযোগ দেওয়া আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ (তাফসিরুল ওয়াসিত লিল-কুরআনিল কারিম, ৩/১৪১৯, মাজমাউল বুহুস আল-ইসলামিয়া, আল-আজহার, ১৯৯২)।
রাসুল (সা.) খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকা ও মনোযোগ ধরে রাখার ওপর অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জুমার দিন ইমাম যখন খুতবা দিচ্ছেন, তখন তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, “চুপ থাকো”, তবে তুমিও অনর্থক কাজে লিপ্ত হলে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪)। অন্যকে চুপ থাকতে বলাও যেখানে অনুচিত বলে গণ্য হয়েছে, সেখানে খুতবার সময় পকেট থেকে টাকা বের করা, দানবাক্স বা ব্যাগ আদান-প্রদান করা কিংবা টাকা গোনার মতো কাজ যে আরও বেশি মনোযোগ নষ্ট করে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই এটা থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ যখন এমন অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করে যে ইমাম মিম্বরে অবস্থান করে খুতবা দিচ্ছেন, তখন ইমাম খুতবা শেষ না করা পর্যন্ত সে কোনো নামাজ আদায় করবে না এবং কোনো কথাও বলবে না।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ২/৪০৯, দারুল মারিফাহ, বৈরুত)।
ইসলামে দান-সদকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ-তাআলা কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় দানশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং রাসুলও দান করতে বারবার উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যে কল্যাণকর বস্তু ব্যয় করবে, আল্লাহ তা অবশ্যই জানেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৭৩)। তবে প্রতিটি ইবাদতেরই নির্ধারিত সময় ও আদব রয়েছে। কোনো নফল বা মুস্তাহাব আমল আদায় করতে গিয়ে যদি ওয়াজিব বা অধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে তা শরয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
খুতবা শোনা মুসল্লির জন্য ওয়াজিব, আর দান সংগ্রহ নফল বা মুস্তাহাব কাজ। ফকিহগণ এ নীতির ভিত্তিতেই খুতবার সময় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা খুতবা শোনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে মুসল্লিদের মধ্যে দানবাক্স বা ব্যাগ ঘুরিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা একই কারণে খুতবার আদবের পরিপন্থি বলে বিবেচিত হয় (ইবনে নুজাইম মিসরি, আল-বাহরুর রায়েক শরহু কানজিদ দাকায়েক, ২/২৫৯, দারুল কুতুবিল ইলমীয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)।
এ কথা মনে রাখা জরুরি যে এখানে দানকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা বা জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ নিঃসন্দেহে নেকির কাজ। তবে তা এমন সময় করা উচিত, যাতে খুতবার মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়। এ জন্য মসজিদ কর্তৃপক্ষের উচিত খুতবার আগে কিংবা নামাজ শেষ হওয়ার পর দান সংগ্রহ করা। এ ছাড়া মসজিদের প্রবেশপথে স্থায়ী দানবাক্স রাখা কিংবা জুমার আগে ঘোষণা দিয়ে দান সংগ্রহ করাও একটি কার্যকর ও শরীয়তসম্মত বিকল্প হতে পারে, এতে দানের সওয়াবও অর্জিত হবে এবং খুতবার প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগও অক্ষুণ্ন থাকবে।





























