কলম্বিয়ায় আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের উদ্ধারে শেষ মুহূর্তের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। বৃহস্পতিবার সকালে দুর্যোগের পর অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা শেষ হওয়ার মুখে উদ্ধার অভিযান এখন ‘চূড়ান্ত ধাপে’ প্রবেশ করেছে।
চলতি শতাব্দীতে কলম্বিয়ায় আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ এবং নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০০ জন। তবে বেসরকারি তথ্যভাণ্ডার অনুযায়ী নিখোঁজের সংখ্যা ৪,১০০ ছাড়িয়েছে। দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলহার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা জানিয়েছেন, দুর্যোগে প্রায় ২৬ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাজধানী বোগোতায় সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্ট বলেন, "আমাদের সব প্রচেষ্টা এখন নিখোঁজদের খুঁজে বের করার ওপর কেন্দ্রীভূত।" তিনি এই দুর্যোগকে ‘অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তিন দিনের জাতীয় শোক প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, "আমরা প্রয়োজনীয় সবকিছু করব। একটি দেশ ও সমাজ হিসেবে আমরা আবারও ঘুরে দাঁড়াব।"
ভূমিকম্পের ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার এই সময়টিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। ক্যালি শহরের বাসিন্দা মার্থা পেরেজ জানান, তাঁর দুই আত্মীয় এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং তিনি অত্যন্ত "অসহায়" বোধ করছেন। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আশা ছাড়ছেন না। ক্যালি শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদার বুধবার জানান, উদ্ধার তৎপরতা এখন শেষ ধাপে প্রবেশ করছে। স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকর্মী ফার্নান্দো লোয়াইজা বলেন, "আমরা সবাই—পুরো ক্যালি শহর—আরও জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার আশা করছি।"
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভূমিকম্পে ১১ হাজারেরও বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে এবং হাজার হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। পেরেইরা শহরে উদ্ধারকর্মীরা একটি ধসে পড়া বেকারির ওপর মনোযোগ দিয়েছেন। সেখানে গত সোমবারের ভূমিকম্পের পর থেকে পাবলো লোয়াইজা নামের এক হকার আটকে আছেন এবং তিনি এখনো জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কম্পন শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করে উদ্ধারকর্মীরা জীবনের লক্ষণ পাওয়ার পর তাঁর স্বজনরা আশার আলো দেখছেন।
পাবলোর ১৬ বছর বয়সী ভাগ্নি সারা লোয়াইজা বলেন, "তারা আমাদের বলছেন এটি তিনিই হতে পারেন। আমার বুক দুরুদুরু কাঁপছে।" স্বজনরা জানান, ভেতর থেকে উদ্ধারকারীদের ডাকে সাড়া দিয়ে পাবলো দুইবার এবং পরে তিনবার টোকা দিয়েছেন, যা উপস্থিত সবার মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধারকর্মী জোহানা সানচেজ বলেন, "প্রতি আধ ঘণ্টা পর পর আমরা সবাইকে শান্ত হতে বলি, যাতে ভেতরে কারও বেঁচে থাকার শব্দ পাওয়া যায় কিনা তা বোঝা যায়। এ পর্যন্ত আমরা তিনজনকে জীবিত এবং তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছি।"
বহু মানুষ আফটারশক বা পরবর্তী কম্পনের ভয়ে অথবা বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় টানা কয়েক রাত খোলা আকাশের নিচে কাটিয়েছেন। রোলদানিলো শহরের একটি প্রসাধন সামগ্রীর দোকানে কাজ করতেন ইউলিয়ানা মেন্দেজ। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানটির ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে জিনিসপত্র হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি বলেন, "এটি যেন একেবারে শূন্য থেকে শুরু করার মতো।"
অন্যদিকে পেরেইরার প্রোভিনেন্সিয়া এলাকায় বাসিন্দারা তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি থেকে আসবাবপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। তাদেরই একজন আইনজীবী আনা পাউলিনা ক্রস্থওয়েট, যাঁর বহুতল অ্যাপার্টমেন্টটি ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, "আমরা এখনো আতঙ্কের মধ্যে আছি। আমাদের সন্তানদের এটা বলার মতো প্রস্তুতি আমাদের নেই যে আমাদের সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে।"
এই কঠিন সময়ে সাধারণ কলম্বিয়ানরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে এবং রক্তদান কেন্দ্রগুলোর সামনে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। রক্তদাতা ফার্নি ক্যাবরেরা বলেন, "এটি মূলত নিজের সম্প্রদায়, শহর এবং দেশের পাশে দাঁড়ানোর একটি তাগিদ।" আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও সহায়তা আসছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ার জন্য ১৫.৫ মিলিয়ন ডলারের জরুরি সহায়তা ঘোষণা করেছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২ মিলিয়ন ইউরো (২.৩ মিলিয়ন ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।





























