প্রমত্তা পদ্মার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এক পরিবারের সন্তান ইশরাত জাহান আমেনা। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তার এই সাফল্য কেবল পরিবারের আনন্দ নয়, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে স্বপ্ন দেখার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমেনার পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১২ বছর আগে পদ্মার করাল গ্রাসে তাদের বসতভিটা ও সহায়-সম্বল বিলীন হয়ে যায়। শিবচরের চরজানাজাত ইউনিয়নের পূর্ব খাস বন্দরখোলা থেকে ভিটেহারা হয়ে তারা বর্তমানে মাদবরের চর ইউনিয়নের চরকান্দি গ্রামে অন্যের জমিতে খাজনা দিয়ে টিনের ঘরে বসবাস করছে। নদীভাঙনের শিকার এই পরিবারটি অন্তত দুইবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
আমেনার বাবা হাবিবুর রহমান পেশায় একজন কৃষক। অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের সংসার চলে। তার মা জরিনা খাতুন দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে আক্রান্ত। অসুস্থতার কারণে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে রান্নাবান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ আমেনাকেই সামলাতে হয়েছে। অভাবের সংসারে প্রাইভেট পড়ার সুযোগও তার জোটেনি।
পারিবারিক সংকটের কথা তুলে ধরে মা জরিনা খাতুন বলেন, আমরা নদীভাঙা মানুষ। কৃষিকাজ করে কোনোমতে সংসার চলে, অভাব নিত্যসঙ্গী। দুই ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে টানাটানির সংসার। আমেনার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় সে নিজের চেষ্টায় বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়েছে। আমরা তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে পারব কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
আমেনার শিক্ষাজীবনের লড়াইটা সহজ ছিল না। নবম শ্রেণিতে তার রোল ছিল ১২, কিন্তু দশম শ্রেণিতে ওঠার পর ফলাফল কিছুটা খারাপ হওয়ায় রোল ১৮ হয়ে যায়। সেই ব্যর্থতা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে না ফেলে বরং আরও জেদি করে তোলে। আমেনা জানায়, বাবার মলিন মুখ দেখে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল ভালো ফল করার। এরপর থেকে সে কঠোর পরিশ্রম শুরু করে এবং শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলে।
নিজের সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আমেনা বলে, আলহামদুলিল্লাহ, আমি অনেক খুশি। অনেক টেনশন থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল পেয়েছি। আমার এই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। এখন ভালো কলেজে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চাই। আমার স্বপ্ন, চিকিৎসক হয়ে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াব।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামসুল হক জানান, আমেনা অত্যন্ত মেধাবী। অসুস্থ মায়ের সেবা ও সংসারের কাজের পাশাপাশি সে নিয়মিত স্কুলে এসে পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে। তার অদম্য চেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে। এ বছর তাদের বিদ্যালয় থেকে মোট ১১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে, যাদের মধ্যে আমেনা অন্যতম। তিনি বিত্তবানদের আমেনার মতো মেধাবীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
গণিতের শিক্ষক পবিত্র চন্দ্র বল্লভ বলেন, আমেনার অধ্যবসায় এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চলার মানসিকতা তাকে ভালো ফল করতে সহায়তা করেছে। এছাড়া ইংরেজি বিভাগের সহকারী শিক্ষক ইয়াসিন কাজী জানান, আমেনা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকত এবং পাঠে মনোযোগী ছিল। তার মধ্যে ভালো কিছু করার প্রবল ইচ্ছা ছিল, যা তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।
আমেনার বাবা হাবিবুর রহমান মেয়ের সাফল্যে আনন্দিত হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। তিনি বলেন, অনেক কষ্টের মধ্যে তাকে পড়াশোনা করিয়েছি। সাধ্য অনুযায়ী মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। প্রতিবেশী মো. ফারুকের মতে, মেয়েটি মেধাবী হলেও তার বাবার আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে আমেনার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ সহজ হবে।
এসএসসির গণ্ডি পেরিয়ে আমেনার সামনে এখন উচ্চমাধ্যমিক ও মেডিকেল কলেজে ভর্তির কঠিন পথ। অর্থের অভাবে যেন তার এই স্বপ্ন থমকে না যায়, সেটিই এখন পরিবারটির প্রধান দুশ্চিন্তা। অভাবকে পেছনে ফেলে জিপিএ-৫ অর্জন করা আমেনার চোখে এখন একটাই লক্ষ্য—চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা।
পদ্মার ভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে অন্যের জমিতে বসবাস করা এক পরিবারের সন্তান আমেনার জিপিএ-৫ এখন শুধু পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন দেখার এক অনন্য উদাহরণ।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেনি পড়াশোনা।
মাত্র একটি কক্ষের ঘরে গাদাগাদি করে রাখা আসবাবপত্রের ফাঁকে রয়েছে তার ছোট্ট পড়ার টেবিল।
সংসারে সব সময় অভাব-অনটন লেগেই থাকে।
তবে পারিবারিক সংকট আমেনার স্বপ্নকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
রেজাল্ট নিয়ে বাড়ি আসার পর আব্বা খুব মন খারাপ করেছিলেন।
তখন আমার মধ্যে জেদ তৈরি হয় আমাকে ভালো করতেই হবে।
চাইলেই বাবার পক্ষে আমার সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
ঘরের রান্নাবান্না করেও আমাকে স্কুলে যেতে হয়েছে।
আমার স্কুলের স্যাররাও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন, বিশেষ করে গণিতের পবিত্র স্যার।
পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা তার পড়ালেখায় বিভিন্ন সময়ে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও অংশ নিত।
সেই স্বপ্ন পূরণে তার প্রয়োজন শুধু সুযোগ ও সহযোগিতার হাত।
সূত্র: Daily Amar Desh






























