মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টি (ডিএপি) বর্তমানে এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। গত ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের নেতৃত্বাধীন ঐক্য সরকারে যোগ দিয়ে ক্ষমতার স্বাদ পেলেও, দলটির জন্য এটি মিশ্র অভিজ্ঞতার সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি সাবাহ, জোহর এবং নেগেরি সেম্বিলান রাজ্যের নির্বাচনে দলটির শোচনীয় পরাজয়ের ছায়া পড়েছে গত ১৬ আগস্ট পুত্রাজায়া ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত দলটির বিশেষ জাতীয় কংগ্রেসে।
বিশেষ করে গত ১ আগস্ট নেগেরি সেম্বিলান রাজ্যের নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় এই জরুরি কংগ্রেসের ডাক দেওয়া হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, আনোয়ার ইব্রাহিম সরকারের দুর্নীতি মামলা পরিচালনার ধরন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার কারণেই ভোটাররা ডিএপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে দলটির নেতৃত্ব একটি বিশেষ জাতীয় কংগ্রেস ডাকার সিদ্ধান্ত নেয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের ঐক্য সরকারে ডিএপি থাকবে কি না, তা নিয়ে ভোটাভুটি হয়।
কংগ্রেসে দলটির প্রতিনিধিরা শেষ পর্যন্ত সরকারে থাকার পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। তবে এই বৈঠকটি ডিএপির ভেতরের গভীর ফাটল ও দ্বিধাদ্বন্দ্বকে সামনে এনেছে। একসময় মালয় শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচক হিসেবে পরিচিত ৬০ বছর বয়সী এই দলটিকে এখন আনোয়ার সরকারের বিভিন্ন ত্রুটি ও দুর্নীতি নিয়ে এক প্রকার নীরব ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে। দলটির এই নীরবতা তাদের প্রধান ভোটব্যাংক—শহুরে ও আধা-শহুরে চীনা বংশোদ্ভূত ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার প্রমাণ মিলেছে টানা তিন মেয়াদে ধরে রাখা আসনগুলো হাতছাড়া হওয়ার মাধ্যমে।
কংগ্রেসে দলটির এই নীরবতা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রয়াত প্রখ্যাত মালয়েশীয় আইনজীবী ও ডিএপির প্রভাবশালী নেতা কারপাল সিংয়ের মেয়ে সঙ্গীত কৌর দেও। তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে উপ-প্রধানমন্ত্রী আহমদ জাহিদ হামিদির বিরুদ্ধে থাকা ৪৭টি দুর্নীতি মামলা থেকে তাকে খালাস না দিয়ে অব্যাহতি (ডিএনএএ) দেওয়ার বিষয়ে ডিএপির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সঙ্গীত বলেন, ভোটাররা অনেক বিষয়েই ডিএপির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিকে আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে সম্পর্ক "গুরুতরভাবে পুনর্বিবেচনা" করার আহ্বান জানান। সঙ্গীতের অভিযোগ, আনোয়ার জোটের শরিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছেন এবং ডিএপির ক্ষতি করে ইউনাইটেড মালয়েস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনকে (ইউএমএনও) শক্তিশালী করছেন।
সরকারে থাকার পক্ষে যুক্তি হিসেবে সংস্কার বাস্তবায়নের যে দাবি করা হয়, তাকেও চ্যালেঞ্জ করেন সঙ্গীত। তিনি বলেন, "আমরা যদি সত্যিই সংস্কার করতে পারতাম, তবে তা এতদিনে হয়ে যেত।" তিনি ডিএপিকে আগামী ১৮ মাস সরকারে থেকে জনগণের উদ্বেগের বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হতে এবং দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করার পরামর্শ দেন।
সঙ্গীতের এই বক্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না পাওয়া গেলেও, ডিএপির জাতীয় চেয়ারম্যান গোবিন্দ সিং দেও-এর বক্তব্যে এর প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। গোবিন্দ প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে অবিলম্বে অ্যাটর্নি জেনারেল ও পাবলিক প্রসিকিউটরের ভূমিকা পৃথকীকরণ এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার মতো দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। গোবিন্দ বলেন, সরকারে থাকার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, দলের মূল সংস্কার এজেন্ডাগুলো আর বিলম্ব না করে এখনই বাস্তবায়ন করতে হবে।
২০২২ সালের শেষদিকে সরকারে যোগ দেওয়ার পর থেকে ডিএপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সোচ্চার বিরোধী দল থেকে নীরব অংশীদারে পরিণত হওয়া। ক্ষমতা অর্জন করাই যেকোনো রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে এবং ডিএপির লক্ষ্যও তা-ই ছিল। তবে এখন ক্ষমতায় থেকেও দলটি তাদের সেই আবেদন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যা তাদের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছিল। ছয় দশকের ইতিহাসে এই দ্বিমুখী সংকট সামাল দেওয়াই এখন দলটির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।






























