২০২৪ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিতওয়ে শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত বাইন ফিউ গ্রামে জান্তা বাহিনীর চালানো ভয়াবহ গণহত্যার রোমহর্ষক বিবরণ দিয়েছেন সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা। মূলত কিয়াউকতাও-এর যুদ্ধে আরাকান আর্মির (এএ) কাছে বড় ধরনের পরাজয় এবং ব্যাপক সেনা নিহতের প্রতিশোধ নিতেই এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল বলে তারা জানিয়েছেন। সম্প্রতি ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাখাইন রাজ্যের পোন্নাগিউন টাউনশিপে বসে দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর কাছে এই লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন বেঁচে যাওয়া তিন নারীসহ পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ২০২৪ সালের ২৯ মে সকাল ৮টার দিকে প্রায় ২০০ সশস্ত্র সেনাসদস্য ছয়টি ট্রাকে করে রাখাইন বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ বাইন ফিউ গ্রামে প্রবেশ করে। সচরাচর বিকেলে বা রাতে টহল দেওয়া জান্তা বাহিনীর সাতসকালে এমন আগমন গ্রামবাসীদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি করে। গ্রামে ঢুকেই সেনারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রায় ২,০০০ বাসিন্দার পুরো গ্রামটি ঘিরে ফেলে, যাতে কেউ পালাতে না পারে। এরপর মাইকের মাধ্যমে সব বাসিন্দাকে দ্রুত গ্রামের কেন্দ্রে জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জান্তা বাহিনীর সদস্যরা বন্দুকের মুখে পঙ্গু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ঘর থেকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনে। সিতওয়েতে ছবি বিক্রি করতে যাওয়ার পথে চিত্রশিল্পী ক্যাও ক্যাও অং-এর মোটরসাইকেল ও পেইন্টিং ভর্তি ব্যাগ জব্দ করে তাকেও ফিরিয়ে আনা হয়। গ্রামের কেন্দ্রে জড়ো করার পর একজন সেনা কর্মকর্তা প্রায় ৮০০ জন পুরুষ ও কিশোরকে চোখ বেঁধে হাত পেছনের দিকে বেঁধে ফেলেন। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তাদের গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে, নারী ও শিশুদের রাস্তার দুই পাশে বসিয়ে রেখে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
হ্লা হ্লা খিন নামে এক নারী, যার স্বামী ও সন্তানকেও পুরুষদের দলে নেওয়া হয়েছিল, জানান যে তারা প্রথমে ভেবেছিলেন সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদের পর হয়তো ছেড়ে দেওয়া হবে। কিন্তু সন্ধ্যা ৭টা থেকে পুরুষদের ওপর চালানো অমানুষিক নির্যাতনের চিৎকার ভেসে আসতে শুরু করে। এরপর রাত ৮টা থেকে শুরু হয়ে পরদিন ভোর ৪টা পর্যন্ত একটানা গুলির শব্দ শোনা যায়। মা ওং থান নামে আরেক নারী, যার বাবা সেই রাতে নিহত হয়েছিলেন, জানান যে পরদিন ভোরে গ্রামের কবরস্থান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে তারা বুঝতে পারেন যে পুরুষদের হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বাগো থেকে আসা এক বার্মিজ ব্যবসায়ীকে বার্মিজ পরিচয়ের কারণে সেনারা ছেড়ে দিলে তিনি জানান, প্রায় ৭০ জন পুরুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে একাধিক গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের লাশ কবরস্থানে ও হ্রদের পাশে পুড়িয়ে বা মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। পিপাসার্ত বাসিন্দাদের প্লাস্টিকের বোতল থেকে সেনাদের মূত্র পান করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং এর প্রতিবাদ করায় রাইফেল দিয়ে পেটানো এক ব্যক্তি দুই দিন পর মারা যান। নির্যাতনের পর অন্তত ১০ জন বাসিন্দা কথা বলা ও হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।
সিতওয়ের ডক বা বন্দর কর্মী স তমানা মুয়ে, যিনি কারেন জাতিগোষ্ঠীর এবং রাখাইন বৌদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে বাইন ফিউ গ্রামে থাকতেন, তিনিও এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ৮০০ পুরুষকে তিনটি সারিতে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সূর্যাস্তের পর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। পালানোর চেষ্টাকালে অন্তত ছয়জনকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করা হয়। স তমানা মুয়ে নিজেও কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) সদস্য সন্দেহে নির্যাতনের শিকার হন, তবে অল্পের জন্য রক্ষা পান।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী দাবি করেছিল, গ্রামের প্রতিটি পরিবার আরাকান আর্মিকে মাসে ২,০০০ কিয়েত (প্রায় ০.৯৫ ডলার) চাঁদা দিত এবং তথ্য ও সেনা রিক্রুট দিয়ে সহায়তা করত। সেনারা ইউএলএ (ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান) সদস্য সন্দেহে ১১ জনের একটি তালিকা তৈরি করে। তাদের শিকল দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করার পর গুলি করে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী মং ওং-এর বাবাও ছিলেন, যিনি পরে পাথেইন কারাগারে নিখোঁজ হন। মং নিজেও আট মাস সিতওয়ে কারাগারে বন্দি ছিলেন। সিতওয়ে শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতের একটি সংযোগ প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় জান্তা বাহিনী এর আশপাশের অন্তত ৩০টি গ্রামে নিয়মিত হামলা, অগ্নিসংযোগ ও উচ্ছেদ অভিযান চালাচ্ছে, যার মধ্যে আউং ডাইন, কিয়ার মা থাউক, মিয়িত নার এবং ওয়ার বো গ্রাম অন্যতম।






























