বাংলাদেশে সাপের কামড় একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ, কৃষিজমি এবং জলাভূমি সংলগ্ন এলাকায় সাপের কামড়ের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। সাপের কামড় খাওয়ার পর সাধারণত মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়। এই আতঙ্কের সুযোগ নিয়ে ওঝা বা কবিরাজের কাছে যাওয়া, ক্ষতস্থান কেটে ফেলা, মুখ দিয়ে বিষ চোষার চেষ্টা করা কিংবা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বাঁধার মতো প্রচলিত ভুল সিদ্ধান্তের কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে।
সাপের কামড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—সব সাপ বিষধর নয়। আবার সব বিষধর সাপের কামড়ে শরীরে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। তাই সাপের প্রজাতি বা বিষের ধরন নিজে অনুমান করে ঘরে বসে সময় নষ্ট করা যাবে না। আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব এমন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে যেখানে জরুরি চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টি-স্নেক ভেনম দেওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে।
কোনো ব্যক্তিকে সাপে কামড়ালে প্রথম কাজ হলো রোগীকে আশ্বস্ত করা এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। আতঙ্কিত হওয়া বা অতিরিক্ত নড়াচড়া করার কারণে শরীরে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগীকে যতটা সম্ভব শান্ত ও স্থির রাখতে হবে। সম্ভব হলে কোনো স্প্লিন্ট বা উপযুক্ত কাঠের টুকরোর সাহায্যে আক্রান্ত অঙ্গটি সোজা ও স্থির করে রাখা ভালো। রোগীকে কোনোভাবেই হাঁটিয়ে হাসপাতালে নেওয়া যাবে না; তাকে স্ট্রেচারে করে বা বহন করে নিয়ে যেতে হবে। সাপের কামড়ের স্থানে ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে, তাই আক্রান্ত অঙ্গের আংটি, চুড়ি, নূপুর বা যেকোনো আঁটসাঁট জিনিস দ্রুত খুলে ফেলতে হবে।
দড়ি বা টর্নিকেট দিয়ে ক্ষতস্থানের ওপর শক্ত করে বাঁধা যাবে না। এতে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে টিস্যু নষ্ট হতে পারে এবং অঙ্গহানির গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়। চিকিৎসকরা বিশেষভাবে শক্ত বাঁধন না দেওয়ার পরামর্শ দেন।ক্ষতস্থান ব্লেড, ছুরি বা অন্য কিছু দিয়ে কাটা যাবে না। এর ফলে অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ এবং টিস্যুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে বিষ বের করার চেষ্টা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।মুখ দিয়ে টেনে বা চুষে বিষ বের করার চেষ্টা করা যাবে না।কালো পাথর, ভেষজ ওষুধ, রাসায়নিক দ্রব্য, আগুন বা গরম কোনো বস্তু দিয়ে ক্ষতস্থানে চিকিৎসা করা যাবে না।ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের ওপর ভরসা করে হাসপাতালে যেতে এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না।ক্ষত কাটা, বিষ চোষা, ‘ব্ল্যাক স্টোন’ বা কালো পাথরের ব্যবহার এবং অন্যান্য অপ্রমাণিত লোকজ পদ্ধতি এড়িয়ে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই একমাত্র বৈজ্ঞানিক পথ।সাপের কামড়ে ব্যান্ডেজ ব্যবহারের নিয়ম নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। সব ধরনের সাপের কামড়ের পর শক্ত করে ব্যান্ডেজ বাঁধা নিরাপদ নয়। বিশেষ করে যেসব সাপের বিষ কামড়ের স্থানে তীব্র ফোলা ও স্থানীয় টিস্যুর ক্ষতি করে, সেখানে ভুলভাবে চাপ প্রয়োগ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
আক্রান্ত ব্যক্তি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা প্রথমেই রোগীর জীবন-সংকট আছে কি না, তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করেন। এ সময় চিকিৎসকরা সাধারণত যে পদক্ষেপগুলো নেন:
রোগীর শ্বাসনালি খোলা আছে কি না তা পরীক্ষা করা।শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা।রক্তচাপ, নাড়ির গতি এবং অন্যান্য শারীরিক সূচক পরীক্ষা করা।রোগীর স্নায়ুবিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা।কামড়ের স্থান এবং শরীরের অন্যান্য অংশে কোনো ফোলা, রক্তপাত বা টিস্যু নষ্ট হওয়ার লক্ষণ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা।প্রয়োজনে শিরায় ক্যানুলা স্থাপন করা।রক্ত ও প্রস্রাবের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা।বিশেষ করে নিউরোটক্সিক বিষের ক্ষেত্রে রোগীর চোখের পাতা পড়ে যাওয়া, কথা বলতে বা গিলতে সমস্যা হওয়া এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশি দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো চিকিৎসকরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। গুরুতর নিউরোটক্সিক বিষক্রিয়ায় রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ রোগীর জীবন রক্ষা করতে পারে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাপের মধ্যে কোবরা (গোখরো), ক্রেইট বা কালাচ এবং বিভিন্ন প্রজাতির ভাইপার (চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার) উল্লেখযোগ্য। সাপের বিষের প্রভাব মূলত এর প্রজাতির ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হয়। কোবরা ও কালাচ সাপের বিষ প্রধানত মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ও শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশিকে অচল করে দেয়। এর ফলে চোখের পাতা ঝুলে পড়া, মুখ ও ঘাড়ের পেশি দুর্বল হওয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে। এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটরসহ দ্রুত কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
সাপের কামড়ের চিকিৎসায় একমাত্র নির্দিষ্ট এবং জীবনরক্ষাকারী উপাদান হলো অ্যান্টিভেনম। তবে মনে রাখতে হবে, সাপে কামড়েছে বললেই ঢালাওভাবে প্রতিটি রোগীকে অ্যান্টিভেনম দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না; কেবল বিষক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা গেলেই চিকিৎসকরা এটি প্রয়োগ করেন।
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০: ১৪আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২১




























