দেশের সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবার শেষ ভরসাস্থল হলো সরকারি হাসপাতাল। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় মানুষ এখানে ছুটে এলেও পদে পদে তাদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশের অনৈতিক বাণিজ্যের কারণে রোগীরা প্রতিনিয়ত জিম্মি হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালে পর্যাপ্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোগীরা বিনামূল্যের ওষুধ পাচ্ছেন না। উল্টো পরীক্ষা-নিয়ন্ত্রণ, অপারেশন কিংবা রোগী ভর্তির জন্য কমিশন নিয়ে রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। এমনকি জরুরি সেবা নিতে আসা গুরুতর রোগীদের জন্য ট্রলি বা হুইলচেয়ার পেতেও গুনতে হচ্ছে টাকা। এছাড়া নোংরা শৌচাগার, নিম্নমানের খাবার এবং বহির্বিভাগে দীর্ঘ অপেক্ষা তো রয়েছেই। রাজধানীর তিনটি প্রধান হাসপাতাল—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে সপ্তাহব্যাপী সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়ে এই চিত্র তুলে এনেছেন স্টাফ রিপোর্টার মুনিরুজ্জামান মিলু, আফজাল হোসেন ও মোহাম্মদ রায়হান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারিভাবে সরবরাহ করা বিনামূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামকে ঘিরে হাসপাতালগুলোতে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রতিদিন হাসপাতালের সেন্ট্রাল স্টোর থেকে নির্ধারিত চাহিদাপত্র বা ইনডেন্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইনচার্জ নার্সরা অপারেশন থিয়েটার ও আন্তঃবিভাগে ওষুধ নিয়ে যান। কিন্তু সেখান থেকে রোগীদের হাতে পৌঁছানোর আগেই মূল্যবান ওষুধ ও সার্জিক্যাল সামগ্রী বেহাত হয়ে যায়। অনেক সময় ক্রেতারা সরাসরি হাসপাতালে এসে এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের কাছ থেকে সরকারি ওষুধ কিনে নিয়ে যান। প্রতিটি ওয়ার্ডের সিস্টার ইনচার্জ ভর্তি থাকা রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন ও ইনজেকশনের তালিকা তৈরি করে সহকারী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরের পর স্টোর থেকে তা সংগ্রহ করেন। তবে রোগীদের বলা হয় যে ওষুধ পাওয়া যায়নি এবং বাইরে থেকে কিনতে হবে। অপারেশন থিয়েটারে অতিরিক্ত ওষুধ ও ইনজেকশন নার্সরা আলাদা করে রাখেন এবং পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহায়তায় তা সরিয়ে ফেলা হয়।
মিটফোর্ড হাসপাতালের ৪০১-৪০২ নম্বর কক্ষের সামনে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে ওষুধ কেনাবেচার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেখানে হাসপাতালের এক কর্মচারীকে জালের ব্যাগে ওষুধ নিয়ে রোগীদের কাছে বিক্রি করতে দেখা যায়। পরে ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, তিনি এক রোগীর স্বজনকে শয্যার পাশেই ওষুধ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বহির্বিভাগ থেকে যেভাবে ওষুধ সরানো হয়, তার পেছনে মূলত থাকেন হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের বহির্বিভাগের ওষুধ বিতরণকেন্দ্রটি দুই নম্বর ভবনের সামনে অবস্থিত। হাসপাতালের ওষুধ বিতরণব্যবস্থায় সাধারণত চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন বা স্লিপের মাধ্যমে রোগী নির্দিষ্ট বিতরণকেন্দ্র থেকে ওষুধ সংগ্রহ করেন। কিন্তু কর্মচারীরা কারসাজি করে ৫, ১০ বা ২০টি (5, 10, 20) করে ওষুধের পাতা বা ফাইল সরিয়ে ফেলেন। এছাড়া চিকিৎসকদের অজ্ঞাতে তাদের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ওষুধ সংগ্রহের ভুয়া স্লিপ তৈরি করে ওষুধ তুলে তা বাইরে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের কাছে বিক্রি করে দেন।
ভুক্তভোগী রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এই অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেছে। লালবাগ থেকে আসা মিন্টু মিয়া তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে পাঁচ দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক্স-রে থেকে শুরু করে সবকিছুই বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে ওষুধ নেই, অথচ টাকা দিলে এখানকার পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ঠিকই ওষুধ এনে দেয়। দোহার থেকে আসা ফাতেমা জানান, তাঁর মেয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চার দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন ছিল। হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দেওয়া হলেও বাকিগুলো ওয়ার্ড বয়দের বললে তারা কম দামে এনে দিয়েছে। মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা আমিন হোসেন মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জানান, কিছু ওষুধ হাসপাতাল থেকে মিললেও বাকিগুলো বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। তবে ওয়ার্ড বয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বললে তারা তাদের সংগ্রহে থাকা ওষুধ পাইকারি দামে এনে দেয়।
ওষুধের এই হরিলুট ছাড়াও হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেতে রোগীদের রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারের মান নিয়ে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন শৌচাগারগুলো যেন রোগ ছড়ানোর একেকটি কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত বিভিন্ন হাসপাতালে তদারকি ও অভিযান চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের যতটুকু সক্ষমতা আছে, তা দিয়ে আমরা চেষ্টা করছি। তবে আমাদের নিজস্ব কোনো বাহিনী বা ম্যাজিস্ট্রেসি ও police-ই ক্ষমতা নেই। রুটিন পরিদর্শনের বাইরে কোনো অভিযান চালাতে গেলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে হয়। এই সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে কিছুটা সময় লাগবে এবং খুব দ্রুতই সবকিছু নিয়মের মধ্যে চলে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
































