ছোট ছোট ইতিবাচক অভ্যাসের নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমেই একজন মানুষ অনন্য ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে ওঠেন। ইসলামে মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্যের চেয়ে তার অভ্যন্তরীণ চরিত্র ও আমলের সৌন্দর্যকে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মহান চরিত্রই ছিল মানুষকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আকৃষ্ট করার মূল চাবিকাঠি। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মানুষের ব্যক্তিত্বকে সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ করে তুলতে অত্যন্ত কার্যকর ৯টি অভ্যাসের কথা আলোচনা করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ীর মুহাদ্দিস ফয়জুল্লাহ রিয়াদ।
প্রথম অভ্যাসটি হলো সত্যবাদিতা, যা মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রধান ভিত্তি। যে ব্যক্তি কথা ও কাজে সততা বজায় রাখে, সে সহজেই মানুষের আস্থা অর্জন করে। মিথ্যা সাময়িকভাবে কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারলেও শেষ পর্যন্ত সত্যই প্রকাশ পায়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা তওবার ১১৯ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ইমানদাররা, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ এ ছাড়া সহিহ বুখারির ৬০৯৪ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, সত্য মানুষকে কল্যাণের পথ দেখায় এবং কল্যাণ মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যায়। মানুষ যখন সত্যকে নিজের অভ্যাসে পরিণত করে, তখন আল্লাহর দরবারে সে ‘সিদ্দিক’ বা পরম সত্যবাদী হিসেবে মর্যাদা পায়।
দ্বিতীয়ত, সময়ানুবর্তিতা একজন মানুষকে দায়িত্বশীল ও পরিপক্ব হিসেবে গড়ে তোলে। হারিয়ে যাওয়া সময় কখনো ফিরে আসে না, তাই সময়কে সম্মান করা জরুরি। রাসুল (সা.) সময়ের গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত হয়—সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪১২)।
তৃতীয় অভ্যাসটি হলো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। সমাজে ও পরিবারে যারা কথা দিয়ে কথা রাখে, তারা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হন। সূরা বনি ইসরাইলের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে।’ অন্যদিকে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মোনাফেকের অন্যতম লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)।
চতুর্থত, সুন্দর ও ভদ্র আচরণ কঠিন হৃদয়কেও জয় করতে পারে। অহংকার মানুষকে সমাজ থেকে দূরে ঠেলে দেয়, আর বিনয়ী ব্যবহার ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করে। সুনানে তিরমিজির ২০১৮ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী আসনে থাকবে তারা, যাদের চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’
পঞ্চম অভ্যাসটি হলো সদা জ্ঞান অর্জন ও নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া। বই পড়া, চিন্তাভাবনা করা এবং অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। সূরা জুমারের ৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেছেন, ‘বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?’ সহিহ মুসলিমের ২৬৯৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য বেহেশতের পথ সহজ করে দেন।’
ষষ্ঠত, আত্মসংযম ও রাগ নিয়ন্ত্রণ মানুষকে মর্যাদাবান করে তোলে। রাগের মাথায় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্ত পরে অনুশোচনার কারণ হয়। সূরা আলে ইমরানের ১৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের গুণ বর্ণনা করে বলেছেন, ‘(মুত্তাকি তারা) যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ সহিহ বুখারির ৬১১৪ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সংযত রাখতে পারে।’
সপ্তম অভ্যাসটি হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ক্ষমাশীলতা। কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী করে এবং ক্ষমা মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে। আল্লাহ তাআলা সূরা ইবরাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেছেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ সহিহ মুসলিমের ২৫৮৮ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।
অষ্টমত, আশাবাদী মনোভাব মানুষকে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের করে আনে। আশাবাদী মানুষ অভিযোগ করে সময় নষ্ট না করে সমাধানের পথ খোঁজে। সূরা জুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন।’ সহিহ মুসলিমের ২৯৯৯ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, মুমিনের প্রতিটি কাজেই কল্যাণ রয়েছে; সচ্ছলতায় সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, যা তার জন্য মঙ্গলজনক।
নবম অভ্যাসটি হলো নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা। নিজের ভুলত্রুটি নিজে সংশোধন করার অভ্যাস ব্যক্তিত্বকে নিখুঁত করে তোলে। দ্বিতীয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এ বিষয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের কাছ থেকে হিসাব নেওয়ার আগে তোমরা নিজেদের হিসাব নাও এবং তোমাদের আমল ওজন করার আগে নিজেদের আমল ওজন করো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯-এর অধীনে বর্ণিত)।
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মানুষের প্রকৃত ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হলো তার তাকওয়া, উত্তম চরিত্র এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত জীবন। বাহ্যিক চাকচিক্য বা কৃত্রিমতার পেছনে না ছুটে যদি পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর এই আদর্শ অভ্যাসগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক ও সামাজিক স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।






























