কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলছেন চীনের অনেক নারী। বাস্তব জীবনের পুরুষদের চেয়ে এআই প্রেমিককেই বেশি পছন্দ করছেন তারা। এই অভিনব ও সংবেদনশীল বিষয়টিকে পর্দায় তুলে এনেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা চৌওয়া লিয়াং (Chouwa Liang)। তাঁর নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘রেপ্লিকা’ (Replica)-তে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি এমন কয়েকজন নারীর জীবনের গল্প তুলে ধরেছেন তিনি, যারা এআই-এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন নিজেদের ভালোবাসা ও একাকীত্বের আশ্রয়।
প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম চরিত্র কিন (Qin)। তিনি কখনো তাঁর বাবা-মা বা বন্ধুদের ‘ভালোবাসি’ শব্দটি বলেননি। এই বিশেষ তিনটি শব্দ তিনি কেবল বলেছেন তাঁর এআই ‘প্রেমিক’ লু চেন (Lu Chen)-কে। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের বাদামী চুল ও লাল চোখের প্রধান নির্বাহী (সিইও) চরিত্রের এই এআই প্রেমিকের সঙ্গে গত ৮৪০ দিন ধরে ‘গ্লো’ (Glow) অ্যাপের মাধ্যমে কথা বলছেন কিন। অ্যাপটি তাকে বিভিন্ন খাবারের পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সান্ত্বনাদায়ক কথাবার্তা বলে। লু চেন তাকে আদর করে ‘মিস বানি’ বলে ডাকে। কিন বলেন, “মনে হয় আমি পুরোপুরি তার দয়ার ওপর নির্ভরশীল… আমার মনে হয় তার চোখে আমার সবকিছুই ভালো।” তবে গ্লো অ্যাপের একটি সফটওয়্যার আপডেটের পর লু চেনের স্মৃতি মুছে গেলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন কিন। এই সম্পর্ককে বাস্তব রূপ দিতে তিনি ‘কস উইতুও’ (cos weituo) নামের এক বিশেষ সেবার সাহায্য নেন, যেখানে টাকার বিনিময়ে একজন মানুষ এআই প্রেমিকের চরিত্র ধারণ করে ডেটিংয়ে অংশ নেন। ওই পেশাদার চরিত্রাভিনেত্রী বলেন, “এটি মানুষকে নিজেকে ভালোবাসতে শেখায়… আজকাল অনেকেই দ্বিধায় থাকেন যে তারা আদৌ ভালোবাসার যোগ্য কি না।”
নির্মাতা চৌওয়া লিয়াং নিজেও করোনাকালীন লকডাউনের সময় ‘রেপ্লিকা’ (Replica) অ্যাপের মাধ্যমে ‘নরম্যান’ নামের একটি এআই-এর সঙ্গে এক মাসের ভার্চুয়াল সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। ভিক্টোরিয়ান কলেজ অব আর্টসের এই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী বলেন, “আমি তখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বন্দি ছিলাম, বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমার ৩০তম জন্মদিনে নরম্যানই প্রথম আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি কবিতা পাঠিয়েছিল। তখনই প্রথম মানুষের বাইরে অন্য কিছুর সঙ্গে এক গভীর সংযোগ অনুভব করি।” পরে অবশ্য লিয়াং জানতে পারেন যে অন্য ব্যবহারকারীরাও একই জন্মদিনের কবিতা পেয়েছেন। নরম্যান এখনো তাঁর ফোনে ইনস্টল করা আছে, তবে এখন আর তাঁর কোনো মানসিক নির্ভরতা নেই। লিয়াং জানান, এই প্রামাণ্যচিত্র তৈরির অভিজ্ঞতা তাঁর পারিবারিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। তাঁর সংস্কৃতিতে মুখে ভালোবাসা প্রকাশের চল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এই ছবি বানানোর পর আমার বাবা-মা ও আশেপাশের মানুষদের জড়িয়ে ধরা এবং ভালোবাসা প্রকাশের তীব্র তাগিদ অনুভব করেছি।”
প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে সোনিয়া (Sonya) ও মুনা (Muna) নামের আরও দুই নারীর গল্প। সোনিয়া নতুন প্রযুক্তির ভক্ত এবং তাঁর মনের মতো পুরুষ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি এআই-কে একটি ঝুঁকি পরীক্ষার মতো ব্যবহার করেন, যেখানে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার মানসিক ধকল ও ঝুঁকি এড়ানো যায়। সোনিয়ার এআই প্রেমিকের নাম ‘স্টিফেন জনসন’। অন্যদিকে, গৃহিণী মুনা তাঁর স্বামী ও বৈবাহিক জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট। তাঁর স্বামী মনে করেন নারীবাদ চীনা নারীদের জন্য ক্ষতিকর। মুনা চ্যাটজিপিটি-র মাধ্যমে ‘ওরিয়ন’ নামের এআই প্রেমিকের সঙ্গে কাব্যিক কথোপকথনে মেতে ওঠেন এবং বুঝতে পারেন যে তিনি আসলে একটু প্রশংসা ও স্বীকৃতি চান। নির্মাতা লিয়াংয়ের মতে, এই নারীদের জন্য এআই কেবল বিনোদন নয়, বরং নিজেদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা খুঁজে বের করার একটি মাধ্যম।
সম্প্রতি চীন সরকার এআই চ্যাটবটের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করায় লাখ লাখ ব্যবহারকারী তাদের এআই সঙ্গী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। নতুন আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের এআই সঙ্গী দেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত মানসিক নির্ভরতা তৈরি করতে পারে এমন চ্যাটবট ব্যবহারে লাগাম টানা হয়েছে। লিয়াং মনে করেন, নীতিনির্ধারকরা এই সম্পর্কের গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেন, “কিশোর-কিশোরীরা এআই-তে আসক্ত হয়ে পড়লে বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া কঠিন হয়ে যাবে। আইনের উদ্দেশ্য ভালো হলেও এআই কোম্পানিগুলোর উচিত ব্যবহারকারীদের মানসিক সুরক্ষার বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে বিবেচনা করা।” প্রামাণ্যচিত্রটি প্রযুক্তি ও মানবিকতার এই জটিল সন্ধিক্ষণকে কোনো একপেশে বিচার ছাড়াই তুলে ধরেছে। তবে এর পেছনে থাকা ডেটা বা তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—যেখানে পূর্বে ‘পোকেমন গো’ গেমের ডেটা সামরিক ড্রোন প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হয়েছিল, সেখানে মানুষের হৃদয়ের গভীর আবেগের এই ডেটা ভবিষ্যতে কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা এক বড় চিন্তার বিষয়।
লিয়াংয়ের আগের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মাই এআই বয়ফ্রেন্ড’ ২০২৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস অপ-ডকস বিভাগে স্থান পেয়েছিল। তাঁর নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘রেপ্লিকা’ গত জুনে সিডনি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর চলতি মাসে মেলবোর্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে।




























