উত্তর গোলার্ধের এক বিস্তীর্ণ অংশে গত বুধবার বছরের একমাত্র পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। ইউরোপ জুড়ে লাখ লাখ মানুষ এই বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করতে জড়ো হন, যার মধ্যে উত্তর স্পেন ছিল পূর্ণগ্রাস দেখার জন্য অন্যতম সেরা স্থান।
সূর্যগ্রহণ মূলত এমন একটি মহাজাগতিক ঘটনা যেখানে চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে সূর্যকে আংশিক বা সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়। পৃথিবীর কোথাও না কোথাও প্রতি ১৮ মাস পর পর সূর্যগ্রহণ ঘটলেও, নির্দিষ্ট কোনো একটি স্থানে পুনরায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে শত শত বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। যেমন স্পেনের বাসিন্দারা ১৯০৫ সালের পর এই প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পেলেন।
এবারের পূর্ণগ্রাসের পথটি মূলত গ্রিনল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের মতো জনমানবহীন এলাকা দিয়ে গেলেও, পশ্চিম আইসল্যান্ড ও উত্তর স্পেনের বাসিন্দারা এর পূর্ণ সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। যদিও পূর্ণগ্রাসের পথটি তুলনামূলকভাবে সরু ছিল, তবে একটি বিশাল অঞ্চল জুড়ে আংশিক সূর্যগ্রহণ দৃশ্যমান হয়েছে। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির 'সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল আর্থ সায়েন্স ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক'-এর জনসংখ্যা বিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৩ কোটি মানুষ এমন এলাকায় বাস করেন যেখানে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সূর্যগ্রহণ দেখা গেছে। এর মধ্যে মাদ্রিদ, লন্ডন ও প্যারিসের মতো ইউরোপের প্রধান প্রধান শহরগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উত্তর গোলার্ধের ওপর দিয়ে অতিক্রম করায় এবারের সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব ছিল বেশ কম, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। প্রথম সূর্যগ্রহণটি দৃশ্যমান হয় রাশিয়ার প্রত্যন্ত উত্তরাঞ্চলে ১৭:০০ ইউটিসি বা ইটি সময় দুপুর ১:০০ টায়। এরপর ইটি দুপুর ১:৩০ মিনিটে উত্তর-পূর্ব গ্রিনল্যান্ড এবং ১:৪৫ মিনিটে পশ্চিম আইসল্যান্ডে এটি পৌঁছায়। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার ৪৫ মিনিট পর ইটি দুপুর ২:৩০ মিনিটে (স্থানীয় সময় রাত ৮:৩২ মিনিটে ভালেন্সিয়ায়) উত্তর স্পেনে পূর্ণগ্রাস শুরু হয়। এর আগে যুক্তরাজ্যে এটি চমৎকারভাবে দেখা যায়, যেখানে লন্ডনে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭:১৩ মিনিটে (ইটি দুপুর ২:১৩ মিনিট) সর্বোচ্চ ৯১ শতাংশ গ্রহণ দেখা যায়। ইটি দুপুর ২:৪৫ মিনিটে এই মহাজাগতিক ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটে। যেসব স্থানে পূর্ণগ্রাস হয়েছিল, সেখানে ভরদুপুরে প্রায় দুই মিনিটের জন্য অন্ধকার নেমে এসেছিল।
অন্যদিকে, উত্তর আমেরিকার বাসিন্দারা আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখার সুযোগ পান, যদিও তা ২০২৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের মতো অতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে এটি দেখার সবচেয়ে ভালো স্থান ছিল আলাস্কার ফেয়ারব্যাঙ্কস, যেখানে ৩৭ শতাংশ গ্রহণ দেখা যায় (স্থানীয় সময় সকাল ৮:২৭ মিনিটে)। এছাড়া টরন্টোতে ৮ শতাংশ (স্থানীয় সময় দুপুর ১:৪০ মিনিট), নিউইয়র্কে ৯ শতাংশ (স্থানীয় সময় দুপুর ১:৫৪ মিনিট), বোস্টনে ১৬ শতাংশ এবং ফিলাডেলফিয়াতে প্রায় ৭ শতাংশ আংশিক গ্রহণ দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সূর্যগ্রহণ দেখার সময় চোখের রেটিনা সুরক্ষিত রাখতে বিশেষ সোলার ফিল্টারযুক্ত চশমা পরা অত্যন্ত জরুরি। কেবল পূর্ণগ্রাসের ওই সংক্ষিপ্ত দুই মিনিটেই চশমা খোলা নিরাপদ, তবে আংশিক সূর্যগ্রহণের পুরোটা সময় চোখের ক্ষতি এড়াতে অবশ্যই চশমা পরে থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের জন্য বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে। ২০৪৪ সালে একটি সূর্যগ্রহণ হবে যা কেবল মন্টানা, উত্তর ডাকোটা ও দক্ষিণ ডাকোটা রাজ্যে দেখা যাবে। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০৪৫ সালে আরেকটি বড় সূর্যগ্রহণ হবে যা ২০১৭ সালের মতো পুরো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দেখা যাবে। এটি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া থেকে শুরু হয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে ফ্লোরিডায় গিয়ে শেষ হবে। সে সময় রেনো (নেভাদা), কলোরাডো স্প্রিংস, তুলসা (ওকলাহোমা), লিটল রক (আরকানসাস), জ্যাকসন (মিসিসিপি) এবং অরল্যান্ডো (ফ্লোরিডা) থেকে পূর্ণগ্রাস দেখা যাবে। এছাড়া ২০৫২ সালে ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনা জুড়ে আরেকটি সূর্যগ্রহণ হবে। তবে উত্তর-পূর্ব যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে হলে ২০৭৯ সালের ১ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।































