সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিলের ঘটনা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শিল্পীরা মনে করছেন, বারবার এ ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া কেবল শিল্পীদের আয়ের পথই সংকুচিত করছে না, বরং দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ লাইনে উচ্চ শব্দের কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করার বিষয়টি নিয়ে শিল্পীরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
শিল্পীদের মতে, কনসার্ট একজন সংগীতশিল্পীর আয়ের প্রধান উৎস। গান কেবল শখ নয়, এটি অনেকের পেশা। হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়া বা শেষ মুহূর্তে নিবন্ধনহীনতার মতো অজুহাত দেখিয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করা শিল্পীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ। যন্ত্রশিল্পী, আয়োজক এবং সংশ্লিষ্ট সবার ওপরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিল্পীরা বলছেন, কোনো গোষ্ঠী বা মহল আপত্তি তুললেই প্রশাসন যদি অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয়, তবে সেটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা হিসেবেই গণ্য হয়। প্রশাসনের দায়িত্ব হওয়া উচিত শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠানটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা। যদি কোনো সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী থানায় ঢুকে মব তৈরি করে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়, তবে সেই থানা কীভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শিল্পীদের দাবি, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্তের ভিত্তিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো উগ্র গোষ্ঠী যেন নিজের ইচ্ছায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া প্রয়োজন।
সংস্কৃতিকে দেশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে শিল্পীরা বলেন, ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ছয় কোটি মানুষ সংগীত অন্তপ্রাণ। গান-বাজনা এ দেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের স্বার্থে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে। সরকারপ্রধানের প্রতি শিল্পীদের আহ্বান, সংস্কৃতি রক্ষার দায়িত্ব সম্মিলিতভাবে পালন করতে হবে।
অনেকের ধারণা, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলতে কোনো কোনো উগ্র গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করছে। শিল্পীরা মনে করেন, বর্তমান সরকার সংস্কৃতিবান্ধব এবং তারা চায় তরুণরা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকুক। তাই এসব ঘটনা সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা হতে পারে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতি শিল্পীদের আহ্বান, এ বিষয়ে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। যদি সরকারের কোনো সংস্থার কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকে, তবে তা শুরুতেই জানানো উচিত। শেষ মুহূর্তে উদ্ভট কারণ দেখিয়ে অনুষ্ঠান বাতিল করা আসল ঘটনাকে আড়াল করার একটি প্রয়াস মাত্র।
সব পেশার মানুষ যদি নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারেন, তবে সংগীতের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কেন বারবার হয়রানি ও হামলার শিকার হতে হবে—এই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। শিল্পীরা চান সারা দেশে নির্বিঘ্নে সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকুক এবং ভয় বা অনিশ্চয়তা ছাড়াই শিল্পীরা তাঁদের কাজ করে যেতে পারেন, এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ জেলা থেকে অনেক মহাপুরুষ উঠে এসেছেন। সেই মাটিতে দাঁড়িয়ে কনসার্ট বন্ধের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিল্পীরা মনে করেন, গানবাজনা বন্ধ করা কোনো সমাধান নয়। বরং সবকিছু স্বচ্ছ, সুন্দর ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নিতে হবে।
পরিশেষে, শিল্পীরা সরকারের কাছে স্পষ্ট দাবি জানিয়েছেন যেন কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হয়। তারা মনে করেন, সাংস্কৃতিক বলয় নষ্ট হয়ে গেলে রাজনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংস্কৃতি ও রাজনীতির মধ্যে সুন্দর সমন্বয় থাকা জরুরি। শিল্পীরা আশা করছেন, সরকার দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা কনসার্ট এ ধরনের বাধার মুখে না পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাক্ষণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটলেও নির্বাচিত সরকারের সময়ে একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হওয়াতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ প্রসঙ্গে দেশের পাঁচ সংগীতশিল্পী ও সুরকারের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখন করেছেন মনজুর কাদের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আমরা একে অন্যকে খোঁচাখুঁচি করার রাজনীতি করছি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু সবাই মিলে দেশের জন্য কীভাবে কিছু করা যায়, দেশটাকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়—সেই জায়গায় আমাদের চিন্তাভাবনা খুব একটা নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ একটি জেলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের সাম্প্রতিক ঘটনাটি পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
সূত্র: প্রথম আলো
































