নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার নেপথ্যে একটি বিশাল হিমবাহের ধস বা ফাটল দায়ী বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। হিমালয় অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ার উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে এই বিপর্যয়টি ঘটল। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিজ্ঞানীরা এই তথ্য জানিয়েছেন।
প্রথমে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধস হয়ে এই বন্যা দেখা দিয়েছে, যাতে অন্তত ৩৮৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। তবে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) স্পষ্ট করেছে যে, এই দুর্যোগটি মূলত একটি 'গ্লেসিয়াল কলাপ্স' বা হিমবাহ ধসের কারণে ঘটেছে, যা কোনো হিমবাহ বা তার অংশবিশেষ ভেঙে পড়ার ঘটনাকে বোঝায়।
বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ এবং ইউএসজিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ধসে পড়া হিমবাহটি উপত্যকার তলদেশে এত তীব্রভাবে আঘাত হানে যে তার ফলে ৫.২ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছিল। ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বিবিসিকে জানান, তাঁর দল ল্যাংটাং লিরুং চূড়ার কাছে নেপালের একটি হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ার বিষয়টি শনাক্ত করেছে। এই স্থানটি বন্যা কবলিত এলাকার প্রায় ১৫ কিলোমিটার (৯ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত। তাঁর অনুমান, হিমবাহটি উত্তর-পশ্চিম দিকে ধসে পড়ে এবং পরে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে নদীর ভাটির দিকে চলে যায়।
আন্তঃসরকারি বৈজ্ঞানিক সংস্থা 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' (ইসিআইএমওডি)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উচ্চ-উচ্চতার অঞ্চল থেকে একটি 'বরফ ও পাথরের তুষারধস' (আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ) সৃষ্টি হয়েছিল। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বরফ এবং পাথরের ধ্বংসাবশেষ ভটে কোশি নদীর উপনদী লেন্দে খোলায় গিয়ে পড়ে। এটি নদীতে জল, পলি এবং বিশাল আকৃতির পাথরসহ একটি তীব্র ঢেউয়ের সৃষ্টি করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে নদীর পানির স্তর ৭ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ভাটি অঞ্চলের বেশ কয়েকটি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশন ভেসে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ সায়েন্সেসের অধ্যাপক মাইক সার্লে জানান, ভূমিধস থেকে শুরু করে বন্যা পর্যন্ত এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কয়েক ঘণ্টা বা এমনকি কয়েক দিনও লেগে থাকতে পারে। তিনি বিবিসিকে বলেন, "ধ্বংসাবশেষের বিশাল তরঙ্গ দেখে মনে হয় প্রথমে একটি ভূমিধস হয়েছিল; যা নদীর পানিকে আটকে কৃত্রিম বাঁধ তৈরি করে এবং পরে তা ভেঙে এক বিশাল বন্যার রূপ নেয়।" ল্যাংটাং লিরুং পর্বতটি হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত এবং এর দুই পাশে অত্যন্ত খাড়া উপত্যকা রয়েছে, যা পানির গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
হিমবাহটি ধসে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে অধ্যাপক সার্লে ব্যাখ্যা করেন যে, দীর্ঘমেয়াদী টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে হিমালয়ের অন্যান্য অংশের মতো ল্যাংটাং লিরুং পর্বতটিও ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে। তিনি বলেন, "এটি অনেকটা গাড়ির নিচে জ্যাক দিয়ে গাড়িটিকে ওপরে তোলার মতো। পাহাড়টি যত ওপরে উঠছে, হিমবাহটি তত বেশি খাড়া হচ্ছে এবং এর ফলে এর কিছু অংশ ভেঙে পড়া অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।" সাধারণত এগুলো ছোট ছোট টুকরো হয় যা সাময়িকভাবে নদী আটকে দেয় এবং সহজেই ভেসে যায়। কিন্তু এবার পুরো হিমবাহটি 'একবারে' ধসে পড়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তিনি আরও জানান, এই দুর্যোগটি মূলত দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ার সংমিশ্রণে ঘটেছে—একটি হলো হিমালয় অঞ্চলের টেকটোনিক উত্থান এবং অন্যটি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও হিমবাহ গলে যাওয়া। এই দুইয়ের প্রভাবেই এখন নিয়মিত বিরতিতে এমন বিপর্যয় ঘটছে।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের বরফ এবং শতাব্দী প্রাচীন জমে থাকা মাটি (পারমাফ্রস্ট) গলে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। চলতি বছরের শুরুতে ইসিআইএমওডি-এর একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০০০ সালের পর থেকে হিন্দু কুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো দ্বিগুণ গতিতে বরফ হারাচ্ছে, যা বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ড. কুক উল্লেখ করেন যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত, সুইজারল্যান্ড এবং ইতালিতেও হিমবাহ ধসের কারণে একই ধরনের বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালে উত্তর ভারতের চামোলি উপত্যকায় হিমালয়ের একটি বিশাল হিমবাহ ধসে প্রায় ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা পরে হিসাব করে দেখেছিলেন যে, ওই ধসের প্রভাব ছিল ১৫টি পারমাণবিক বোমার সমান। এমনকি গত বছরও তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ ফেটে নেপালের এই একই অঞ্চলে বন্যা হয়েছিল।
ইসিআইএমওডি-এর বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফারুক আজম বলেন, হিমায়িত অঞ্চলের (ক্রায়োস্ফিয়ার) পরিবর্তন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান এবং এই পরিবর্তনের গতি অত্যন্ত দ্রুত।
জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট প্রভাব একক কোনো ঘটনার ওপর সরাসরি প্রমাণ করা কঠিন হলেও, ড. কুক বলেন, "এই ধরনের ঘটনাগুলোর ধরন লক্ষ্য করলে বোঝা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি বড় প্রভাব রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ সংকুচিত হচ্ছে, প্রচুর বরফ গলছে এবং পাহাড়ের ঢালকে ধরে রাখা পারমাফ্রস্ট উষ্ণ হয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। যার ফলে ভূমিধস, হিমবাহ ধস এবং হ্রদ বিস্ফোরণের মতো ঘটনাগুলো বৃদ্ধি পাচ্ছে।"































