যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ মিসরের ব্যাংক ‘ব্যাংক মিসর’-এর সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) শাখাকে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ইরানের ছায়া ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য ১.৮ বিলিয়ন (১৮০ কোটি) ডলার লেনদেন করার অভিযোগ এনেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট কর্তৃক বিশ্বজুড়ে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার লক্ষ্যে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামক নিষেধাজ্ঞা অভিযান শুরু করার মাত্র চার দিন পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
কোনো স্থায়ী সমাধান ছাড়াই যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসে পড়ার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক চাপ তীব্রতর করেছে। বিশ্বব্যাপী আর্থিক ব্যবস্থায় তেহরানের প্রবেশাধিকার আরও সংকুচিত করাই এর লক্ষ্য। এই অভিযানকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ (economic D-Day) হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেন, “বিশ্বজুড়ে আমাদের লক্ষ্য হলো এই অত্যাচারী শাসন টিকিয়ে রাখা প্রতিটি অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দেওয়া, যতক্ষণ না তেহরান সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে।”
এই অর্থনৈতিক অভিযানের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের তেল বাণিজ্য, যা তেহরানের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেমমাতি গত সপ্তাহে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানান, নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি শূন্যে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, “তেল রপ্তানিতে আমরা যে বাধার সম্মুখীন হচ্ছি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটিই বাস্তব যে আমরা কোনো তেল রপ্তানি করছি না।”
গত ১৪ জুলাই সাময়িক শিথিলতার পর মার্কিন প্রশাসন ইরানি বন্দরে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করে। কমোডিটি ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানি অপরিশোধিত তেলের লোডিং জুলাই মাসে দৈনিক গড়ে ৮ লাখ ৯৩ হাজার ব্যারেল থেকে কমে আগস্টে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব মিসৌরি-সেন্ট লুইসের অর্থনৈতিক ইতিহাসের অধ্যাপক ম্যাক্স গিলম্যান বলেন, “আমার মনে হয় ইরানের বাণিজ্যের ওপর নৌ অবরোধই ওয়াশিংটনের প্রধান অর্থনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে বজায় থাকবে এবং এটি অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে।”
তেল বিক্রির পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরানের ইতিমধ্যে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ক্ষমতাও সীমিত করছে। হেমমাতি জানান, তেহরানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ওয়াশিংটন অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং তা তুলতে দিচ্ছে না। এছাড়া গত জুনে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পাদিত ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম’ ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির আওতায় যে ইরানি তহবিল ছাড় করার কথা ছিল, তাও এখনো অবমুক্ত করা হয়নি। এর ফলে ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং অনানুষ্ঠানিক বাজারে প্রতি ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মান রেকর্ড ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) রিয়ালে নেমে গেছে।
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা, ছায়া ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং তৃতীয় দেশের মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভর করছে। মার্কিন প্রশাসন এখন সেসব খাতকেও লক্ষ্যবস্তু করছে। ট্রেজারি বিভাগ নতুন কিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে যার মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানি ও ব্যক্তিরা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে পারে; এর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, সোনা, বিমান চলাচল এবং শিপিং। এছাড়া বিশ্বজুড়ে ইরানকে সহায়তাকারী ৬০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তৈরির কাজ চলছে।
ট্রেজারি ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর দলগুলো তাদের বিদেশি সমকক্ষদের সঙ্গে বৈঠক করে কার্যক্রম বন্ধের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “চিহ্নিত কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য প্রতিটি দেশের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। তারা ব্যবস্থা না নিলে আমরা একতরফা পদক্ষেপ নেব।” তিনি ইরানের ‘ব্যাংক মেল্লি’র প্রতিটি শাখা বন্ধ করার নির্দেশ দেন এবং বলেন, “ইরানের হয়ে অর্থ পাচারে সহায়তাকারী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলার ব্যবস্থা থেকে বাদ দেওয়া হবে। সময় ঘনিয়ে আসছে।”
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ইরানের অর্থনীতি ৬.১% সংকুচিত হতে পারে। গড় মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ৫০.৯% থেকে বেড়ে ৬৮.৯% এ পৌঁছাতে পারে। ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্যমতে, জুলাই মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৮৭.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। শ্রমবাজারেরও অবনতি হয়েছে; বসন্তকালে বেকারত্বের হার বেড়ে ৯.১% হয়েছে এবং কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ।
তবে এই চাপের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তাৎক্ষণিক শাস্তির বদলে কেন সময় দেওয়া হচ্ছে—এমন প্রশ্নে বেসেন্ট বলেন, “আমরা সবাইকে তাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি। আমি কেন বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে যাব?” তেলের দাম ৭০ থেকে ৮০ ডলারের মধ্যে রাখা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং রাশিয়ার রপ্তানি আয় সীমিত করতে সাহায্য করবে বলে মনে করেন গিলম্যান। তবে দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করা ইরানের ওপর এই নজিরবিহীন চাপ শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ছাড় বা স্থায়ী নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।





























