হঠাৎ করেই একজন মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান। থানায় কোনো মামলা নেওয়া হয় না, আদালতে তাকে হাজির করা হয় না। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন বা আদৌ বেঁচে আছেন কি না—এমন কোনো প্রশ্নের উত্তর মেলে না। শুধু দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অন্তহীন অপেক্ষা। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে গুমের শিকার হওয়া হাজারো পরিবারের সময় এখন কাটছে কেবল প্রিয়জনের স্মৃতি হাতড়ে আর কান্নায়। এই দুঃসহ অপেক্ষার মধ্যেই দেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুম হওয়া মানুষদের বিষয়ে তদন্ত করা এবং তাদের পরিণতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে নতুন করে আর কেউ গুমের শিকার হচ্ছে না।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ২০১০ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী সংস্থার বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার দায়িত্ব পায় এই কমিশন। গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, তারা মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ পেয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিরা মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি হতে পারে। ভয়, সামাজিক চাপ ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক পরিবার কমিশনের কাছে না আসায় গুমের শিকার মানুষের সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গুমের আলোচনায় সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে সামনে এসেছে ‘আয়না ঘর’। ২০২৪ সালের পর গোপন আটককেন্দ্র থেকে মুক্ত হওয়া একাধিক ব্যক্তি তাদের বন্দিজীবনের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তদন্ত কমিশনও ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় একাধিক গোপন ডিটেনশন সেন্টারের সন্ধান পেয়েছে। কমিশন জানায়, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সদর দপ্তরের ভেতরের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলসহ (যেখানে অন্তত ২২টি সেল ছিল), র্যাব, ডিবি ও সিটিটিসি-সহ বিভিন্ন সংস্থার অন্তত ৮টির বেশি গোপন বন্দিশালা বা আয়নাঘরের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু তালিকা তৈরি বা অভিযোগ নথিভুক্ত করলেই এই অপেক্ষার অবসান হবে না। প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, জড়িতদের শনাক্তকরণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, বিচার এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য প্রকাশ এবং পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করতে হবে।
মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য মো. নূর খান লিটন বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুমের ঘটনাগুলো আড়াল করা হয়েছে। তাই গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে তা কার্যকর হবে না। তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সৎ, দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান। কমিশনের আরেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, পুলিশের কাছে গুমের অভিযোগ দেওয়া এবং পুলিশকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা রয়েছে। আগে পুলিশ অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ করত না। গুম কমিশনের কাছে পাওয়া দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ২৫০টিতে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।
গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গুম মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। মৃত্যুর পর পরিবার শোকপ্রকাশ ও দাফন করতে পারে, কিন্তু গুমের শিকার হলে পরিবার এক স্থগিত অবস্থায় থাকে এবং সামাজিক কলঙ্ক ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়। আগের সরকারের আমলে গুম রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল এবং চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে এর অবসান ঘটেছে।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশে গুমের সংস্কৃতির অবসান ঘটেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর এখন পর্যন্ত গুমের কোনো অভিযোগ ওঠেনি। বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ২৯শে আগস্ট জোরপূর্বক গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করে। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন করে। গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে সরকার ‘জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’ নামে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিলটি ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি বিশ্বজুড়ে গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সহমর্মিতা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, পতিত ও পলাতক ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের অধিকার dমনের জন্য গুম-অপহরণের অমানবিক পথ বেছে নিয়েছিল এবং ‘আয়নাঘর’ নামক গোপন বন্দিশালা তৈরি করেছিল। দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব মতে, বিগত সরকার কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করেছে। ভবিষ্যতে গুম বন্ধে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’।
এদিকে, মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ রাজধানীর বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। সভায় গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও গুমফেরত ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়ে তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সভায় গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ বাতিলের দাবি জানানো হয়। গত ৩রা আগস্ট মন্ত্রিসভা এই আইনটি অনুমোদন করে এবং ২৭শে আগস্ট খসড়া আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে, অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্তঃবাহিনীর তদন্ত দলের কাছে সরকার তদন্তভার অর্পণ করতে পারবে। তবে অধিকার এবং ভুক্তভোগীদের মতে, পুলিশ বা অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, কারণ অতীতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে।
আলোচনা সভায় চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে ২০১২ সালের ২৪শে আগস্ট গুম হওয়া মোহাম্মদ ফিরোজ খান পিন্টুর স্ত্রী আমেনা আক্তার মিষ্টি তার দুঃখের কথা জানান। তার স্বামী গুম হওয়ার তিন মাস আগে তার দেবরকেও ঢাকার মিরপুর-১ থেকে পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছিল। মিষ্টি বলেন, স্বামীকে হারানোর সময় তাদের সন্তানের বয়স ছিল দুই বছর। ২০২০ (2020) সাল থেকে তিনি সাহস করে স্বামীর সন্ধানে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ১৫ বছর পরও তাকে স্বামীর সন্ধান চাইতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমেনার প্রশ্ন- কেন এখনো আমরা কষ্ট করবো? আমার স্বামী কোথায় আছে, কেমন আছে- এটুকু জানতে চাই। তিনি বলেন, গুমের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে সাজা দেওয়া হোক এবং স্বামী-দেবরকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আমার মতো কোনো স্ত্রীকে যেন আর স্বামীর সন্ধানে কাঁদতে না হয়, বাংলাদেশে যেন আর গুম দেখতে না হয়। মিষ্টির শাশুড়ির দুই সন্তানই গুম হয়েছেন।
চলতি বছরে বাগেরহাটের মোংলা এলাকা থেকে কোস্ট গার্ড কর্তৃক গুমের শিকার হন মিরাজ শেখ। তার স্ত্রী মুক্তা খাতুন জানান, স্বামীর সন্ধান করতে গিয়ে তিনি নিজে এবং তার পরিবার হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। ১০ই এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় কোস্ট গার্ড মিরাজকে আটক করে এবং নির্যাতন করে স্পিডবোটে করে নিয়ে যায়। এরপর সন্ধান চাইতে গেলে তাদের নামে সন্ত্রাসী ও অজ্ঞাতনামা মামলা দেওয়া হয় এবং গ্রামবাসীদের ওপর গুলি চালানো হয়। মুক্তা, তার শাশুড়ি ও ননদকে নারী পুলিশ ছাড়াই আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় এবং তারা ২৭ দিন জেল খাটেন। মুক্তা জানান, নির্যাতনের মাধ্যমে তার স্বামীর নখ উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং পাঁচ মাস ধরে তার কোনো খোঁজ নেই।
ভয়েস অব এনফোর্সড ডিসঅ্যাপেয়ার্ড পারসন্স-এর প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল কাইয়ুম নিজেই গুমের শিকার হয়েছিলেন। ২০১৭ সালের ১০ই এপ্রিল রামপুরা থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় র্যাব-১১-এর তৎকালীন কর্মকর্তা এসএইচ আরিফুদ্দিন (যিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি)। ২৩ দিন গুম রেখে নির্যাতনের পর তাকে চালান দেওয়া হয়। চার মাস পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে বের হওয়ার সময় জেলগেট থেকে তাকে আবারও গুম করা হয়। কাইয়ুম বলেন, গুমের সময় তাকে উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে পেটানো হতো এবং পরিবারকে নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মানসিক নির্যাতন করা হতো।
গুমের শিকার হওয়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসিনুর রহমান প্রস্তাবিত আইনের সমালোচনা করে বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি সব প্রমাণ করতে না পারলে ৫ বছরের দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু যেখানে কোনো আলামত রাখা হয় না, সেখানে প্রমাণ করা কীভাবে সম্ভব? তিনি নিজেও দুইবার গুম হয়েছেন বলে জানান।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের সংশোধন দাবি করেন। তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের গুমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সিভিলিয়ানদের পক্ষে গুমের ঘটনা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তাই আইনটি আরও সর্বজনীন ও পোলিশড হওয়া উচিত। ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান বলেন, এই আইন দিয়ে গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনকে বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।






























