ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্বে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির আপসহীন ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তিনি অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, আক্রান্ত হলে লড়াই করাই স্বাভাবিক। সাবেক এই সেন্ট্রাল ব্যাংক গভর্নরের এমন রণংদেহী রূপ অনেককে অবাক করলেও তার প্রাক্তন সহকর্মীরা এতে বিন্দুমাত্র বিস্মিত নন।
একটি সংবাদ সম্মেলনে কার্নি বলেন, "গত বসন্তে আমি সতর্ক করেছিলাম যে আমেরিকা আমাদের ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে যাতে তারা আমাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে তা কখনোই ঘটবে না এবং আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি। তারা যা প্রস্তাব করেছে আমরা তা গ্রহণ করতে পারি না এবং তারা যা চেয়েছে তা আমরা দেব না।" বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, তিনি কি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন? কার্নি উত্তর দেন, "আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। আক্রান্ত হলে লড়াইয়ে জড়াতে হয়। আমাদের ওপর হামলা হয়েছে।"
২০২১ সালে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে কার্নির সাথে কাজ করা একজন সহকর্মী জানান, কার্নি অত্যন্ত সংকল্পবদ্ধ এবং সহজে পিছু হটার পাত্র নন। ট্রাম্পের সামনে তার এই দৃঢ় অবস্থান তাই অপ্রত্যাশিত ছিল না। গোল্ডম্যান স্যাক্স থেকে উঠে আসা কার্নি ২০১৩ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ চ্যান্সেলর জর্জ অসবর্ন কর্তৃক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর হিসেবে মনোনীত হন। সেখানে তার কাজের ধরন ছিল বেশ কঠোর। পরবর্তীতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি সেই শৃঙ্খলা বজায় রেখেছেন। তিনি খুব ভোরে ওঠেন, নিয়মিত দৌড়ান এবং মন্ত্রীদের নিজ নিজ ফাইলের খুঁটিনাটি মুখস্থ রাখার নির্দেশ দেন। তার কার্যালয়ে কর্মীদের আনুষ্ঠানিক ব্যবসায়িক পোশাক পরা এবং ব্রিটিশ বানানে নথিপত্র লেখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে থাকাকালেই কার্নি দেখিয়েছেন যে প্রয়োজনে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান নিতে দ্বিধা করেন না। ব্রেক্সিটের কারণে যুক্তরাজ্য মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করায় কনজারভেটিভ পার্টির বার্নার্ড জেনকিন তাকে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে নাক না গলাতে বলেছিলেন। জবাবে কার্নি অত্যন্ত কড়া ভাষায় জেনকিনকে লিখেছিলেন যে, সেন্ট্রাল ব্যাংকের স্বাধীনতা সম্পর্কে জেনকিনের মৌলিক ভুল ধারণা রয়েছে। যদিও ব্রেক্সিট পরবর্তী মন্দা এড়ানো গিয়েছিল, যার পেছনে কার্নির দ্রুত সুদের হার হ্রাস এবং বন্ড ক্রয়ের মতো সময়োপযোগী পদক্ষেপের বড় ভূমিকা ছিল বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন।
প্রুডেন্সিয়াল রেগুলেশন অথরিটির সাবেক বোর্ড সদস্য চার্লস র্যান্ডেল কার্নিকে তার কর্মজীবনের অন্যতম চিত্তাকর্ষক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জোসেফ স্টেইনবার্গ মনে করেন, কার্নি বর্তমানে জনসমক্ষে সার্বভৌমত্বের ওপর জোর দিলেও গোপনে অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতার কথাই ভাবছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিলে কানাডাকেই বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি পোহাতে হবে। তা সত্ত্বেও, ড্যাভোস সম্মেলনে কার্নি সতর্ক করেছিলেন যে আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে নতি স্বীকার কখনো নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তার পূর্বসূরি জাস্টিন ট্রুডোর কার্বন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির নীতি বাতিল করেছেন, তেল পাইপলাইনের মতো বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করছেন এবং প্রতিরক্ষায় শত কোটি ডলার বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। জনমত জরিপকারী ডেভিড কোলেটো কার্নির এই প্রশাসনকে "যুদ্ধ ছাড়াই যুদ্ধের প্রস্তুতিতে থাকা সরকার" হিসেবে অভিহিত করেছেন। কার্নি সম্প্রতি কানাডাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, "কানাডার মানুষ আবহাওয়ার কাছে নতি স্বীকার করে না, বরং আমরা এতে টিকে থাকি। বাতাস কোন দিকে বইছে তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষা করি না বা ঝড়ের মুখে নিজেদের সঁপে দিই না। আমরা নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করি। আমরা আমাদের নিজেদের আবহাওয়া তৈরি করি। উপকূল থেকে উপকূলে, কানাডায় আমরাই আমাদের ঘরের মালিক।"






























