কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা আবার ফিরে গেছেন ১৯৯৯ সালের এক দুঃস্বপ্নে। সেদিনের সেই ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি তাদের তাড়া করে ফিরছে। সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্পে অন্তত ২৮১ জন নিহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন রাজ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন শত শত মানুষ।
৬৮ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নগর পরিকল্পনাবিদ ও সাবেক অধ্যাপক জাহির রদ্রিগেজ সোমবার সকালে কলম্বিয়ার পেরেইরা শহরের কাছে ঘন কালো মেঘ জমতে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন কী ঘটতে চলেছে। ১৯৯৯ সালে আর্মেনিয়ায় সংঘটিত ভূমিকম্পে প্রায় ১,২০০ মানুষের মৃত্যুর পর তিনি উদ্ধারকাজে নেমেছিলেন। এবারও তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি। কাচ ভাঙার শব্দ এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল বেয়ে পানি পড়ার দৃশ্য দেখে তিনি বলেন, "এক ধরনের অসহায়ত্ব গ্রাস করে।"
রদ্রিগেজ শতাব্দীর শুরুতে কলম্বিয়ার কফি অঞ্চলে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের পর ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। ১৯৯৫ সালের ওসাকা ভূমিকম্পে কাজ করা জাপানি উদ্ধারকারী দলের কাছ থেকে পাওয়া একটি পরামর্শ তিনি এখনো মনে রেখেছেন, "এখানে কয়েক দিন বা কয়েক মাস থাকতে হবে ভাবাটা মস্ত বড় ভুল। তোমাদের এখানে বছরের পর বছর কাটাতে হবে।" ২০১০ সালে চিলির তালকায় ভূমিকম্পের পরও কাজ করেছিলেন রদ্রিগেজ। তিনি জানান, ঘরহারা মানুষ এখন পার্কগুলোতে অস্থায়ী তাবু খাটিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন।
ভূমিকম্পের মাত্র কয়েক দিন আগে দায়িত্ব নেওয়া কলম্বিয়ার নতুন সরকার এই অস্থায়ী ক্যাম্পগুলো তৈরিতে সহায়তা করছে। তবে রদ্রিগেজ মনে করেন, এটি একটি সাময়িক পদক্ষেপ মাত্র, কারণ দীর্ঘমেয়াদে পুনর্বাসনের জন্য স্থায়ী আবাসন জরুরি। তার মতে, বর্তমানে তিনটি কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রথমত, ক্ষতিগ্রস্তদের গণনা করা; দ্বিতীয়ত, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; এবং তৃতীয়ত, পুনর্গঠন পরিকল্পনা করা।
সোমবারের ভূমিকম্পে রদ্রিগেজের এক বন্ধু ও সহকর্মী নগর পরিকল্পনাবিদের বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি অন্য ভবনের ওপর ভেঙে পড়ে। কিন্তু চুরির ভয়ে তার বন্ধু সেই ধ্বংসস্তূপের পাশ থেকে সরতে রাজি হননি, যা ১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পের পরও দেখা গিয়েছিল। রদ্রিগেজের বোন, ৬৫ বছর বয়সী লিলিয়ানা রদ্রিগেজও এই ভূমিকম্পে নিজের ফ্ল্যাট হারিয়েছেন। তার চোখে হতাশা আর অনিশ্চয়তা দেখছেন রদ্রিগেজ। রাস্তার পাশে মানুষের রান্না করার দৃশ্য দেখে তিনি বলেন, "দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, মাসের পর মাস আশ্রয়ের আশায় তাদের অপেক্ষা করতে হবে।"
১৯৯৯ সালের ভূমিকম্পের পর দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের রূপরেখা তৈরি করেছিলেন এভারার্ডো মুরিল্লো। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেস পাস্টরানা তাকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য একটি বিশেষ তহবিল ও সংস্থা গঠনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরপর থেকে তিনি বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার হয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার লা গুয়াইরা শহরে গিয়েও তিনি উদ্ধার ও পুনর্গঠন কাজে সহায়তা করেছেন।
মুরিল্লোর মতে, দুর্যোগের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো "সামাজিক প্রকৌশল" বা সমাজকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, "মানুষ তাদের জীবনের চেনা পথ হারিয়ে ফেলে। এটাই একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়।" তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করেন। কলম্বিয়ার দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থা হাইতি বা ভেনিজুয়েলার চেয়ে অনেক উন্নত বলে উল্লেখ করেন তিনি। ২০১০ সালে হাইতির ভূমিকম্পের পর কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, সেখানকার মানুষের কাছে কোনো পরিচয়পত্র বা বাড়ির মালিকানার নথি ছিল না। তবে কলম্বিয়ায় ১৯৯৯ সালের পর ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ করায় এবার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তুলনামূলক কম হয়েছে।
































