আসন্ন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমটি গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত হতে যাচ্ছে। এবার নয়টি ক্লাব সম্পূর্ণ নতুন ম্যানেজার নিয়ে মাঠে নামছে। এর মধ্যে রয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল, চেলসি, বোর্নমাউথ, নটিংহাম ফরেস্ট, ক্রিস্টাল প্যালেস, ফুলহ্যাম, ইপসউইচ এবং নিউক্যাসল। এছাড়া ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মাইকেল ক্যারিক এবং টটেনহ্যাম হটস্পারের রবার্তো ডি জার্বি তাদের প্রথম পূর্ণ মৌসুম শুরু করতে যাচ্ছেন। এত পরিবর্তনের কারণে দলগুলোর শুরুর একাদশ কেমন হবে বা নতুন সিস্টেমে খেলোয়াড়রা কীভাবে খাপ খাইয়ে নেবেন, তা আগে থেকে অনুমান করা ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লিগ (এফপিএল) ম্যানেজারদের জন্য বেশ কঠিন হবে।
বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার মাত্র ৩৩ দিন পর প্রিমিয়ার লিগ শুরু হচ্ছে। আর্সেনালের ডেক্লান রাইস এবং বুকায়ো সাকার মতো ইংলিশ খেলোয়াড়রা লিগ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ক্লাবে ফিরেছেন, তাই প্রথম কয়েকটি ম্যাচে তাদের বিশ্রাম দিয়ে খেলানো হতে পারে। ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড সাধারণত মৌসুমের শুরুতেই দারুণ ফর্মে থাকেন এবং এর আগে দুইবার প্রথম ছয় ম্যাচেই ১০ গোল করার কীর্তি গড়েছেন। তবে নরওয়ের হয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার ধকল এবং সংক্ষিপ্ত প্রাক-মৌসুমের প্রভাব তার ওপর কেমন পড়ে, তা দেখার বিষয়। হালান্ড গত সপ্তাহে মাত্র প্রাক-মৌসুম অনুশীলনে ফিরেছেন।
নতুন ক্লাব বা লিগের সাথে মানিয়ে নিতে খেলোয়াড়দের কিছুটা সময় লাগে। গত গ্রীষ্মে বড় অঙ্কের ট্রান্সফার ফি নিয়ে লিভারপুলে যোগ দেওয়া ফ্লোরিয়ান ভির্টজ এর বড় উদাহরণ, যিনি প্রিমিয়ার লিগের গতি ও শারীরিক শক্তির সাথে মানিয়ে নিতে বেশ সংগ্রাম করেছিলেন। অন্যদিকে, মর্গান রজার্স এবারের গ্রীষ্মের সবচেয়ে বড় সাইনিং। অ্যাস্টন ভিলার হয়ে গত মৌসুমে দুর্দান্ত পারফর্ম করা এবং প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও, চেলসিতে জাবি আলোনসোর অধীনে তিনি কীভাবে খেলবেন তা না জেনে সরাসরি তাকে দলে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গত মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধে মাইকেল ক্যারিকের অধীনে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দারুণ খেললেও তারা কেবল প্রিমিয়ার লিগেই মনোযোগী ছিল। এবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ব্যস্ত সূচির সাথে ব্রুনো ফার্নান্দেসের মতো খেলোয়াড়দের ক্লান্তি কীভাবে সামলানো হবে, তা চিন্তার বিষয়। একইভাবে ক্রিস্টাল প্যালেস, বোর্নমাউথ ও সান্ডারল্যান্ডকে ইউরোপা লিগ এবং ব্রাইটনকে কনফারেন্স লিগে খেলতে হবে, যা তাদের ঘরোয়া সূচিকে আরও কঠিন করে তুলবে। এর বিপরীতে, চেলসি এবং টটেনহ্যাম এবার ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় নেই। ফলে জাবি আলোনসো এবং রবার্তো ডি জার্বি তাদের খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত বিশ্রাম দেওয়ার পাশাপাশি অনুশীলনের জন্য বেশি সময় পাবেন। গত মৌসুমে চেলসি ১০ম এবং টটেনহ্যাম ১৭তম স্থানে শেষ করেছিল, যা থেকে এবার তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
২০০৪ সালের পর কেবল জোসে মরিনহো, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন এবং পেপ গার্দিওলাই প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা ধরে রাখতে পেরেছেন। গত মৌসুমের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির পর আর্সেনালের পারফরম্যান্সে কিছুটা ঘাটতি দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে বিশ্বকাপে ডেক্লান রাইসের ক্লান্তি স্পষ্ট ছিল। আর্সেনাল ফেভারিট হিসেবে শুরু করলেও গতবার তারা সেট-পিস এবং ক্লিন শিটের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল। এছাড়া ডিফেন্ডার উইলিয়াম সালিবা মৌসুমের প্রথম কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকা দলটির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
নটিংহাম ফরেস্টে থাকার সময় ৫.৫ মিলিয়ন মূল্যের এলিয়ট অ্যান্ডারসন গত মৌসুমের অন্যতম সেরা এফপিএল পারফর্মার ছিলেন। মিডফিল্ডে ট্যাকল, ব্লক এবং রিকভারির মাধ্যমে ডিফেন্সিভ পয়েন্টের পাশাপাশি আক্রমণভাগেও অবদান রেখে তিনি মিডফিল্ডারদের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়েছিলেন। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের হয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্সের পর ১১৬ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তিনি ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েছেন। এখন তার মূল্য বেড়ে হয়েছে ৬.৫ মিলিয়ন। তবে নটিংহাম ফরেস্ট যেখানে বল দখলের দিক থেকে ১৮তম ছিল, সেখানে ম্যানচেস্টার সিটি শীর্ষে থাকে। সিটি বেশিরভাগ ম্যাচ আধিপত্য নিয়ে খেলায় অ্যান্ডারসনের ডিফেন্সিভ পয়েন্ট পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে, যদিও তার ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর সুযোগ বাড়বে।
টানা দুই মৌসুম তিনটি করে প্রমোটেড ক্লাব সরাসরি অবনমিত হওয়ার পর, গত মৌসুমে সান্ডারল্যান্ড চমক দেখিয়েছে। এফপিএল মূল্যের দিক থেকে সান্ডারল্যান্ডের ডিফেন্ডার নর্ডি মুকিয়েলে মাত্র ৪.০ মিলিয়নের সর্বনিম্ন মূল্যে শুরু করে ১৫১ পয়েন্ট অর্জন করেছিলেন। চ্যাম্পিয়নশিপ ও প্রিমিয়ার লিগের ব্যবধান অনেক হলেও এবার কভেন্ট্রি, ইপসউইচ এবং হাল সিটিকে অবহেলা করা যাবে না।
এফপিএল ম্যানেজাররা প্রতি মৌসুমে দুই সেট চিপস (ওয়াইল্ডকার্ড, বেঞ্চ বুস্ট এবং ট্রিপল ক্যাপ্টেন) পান। প্রথম সেটটি ১৯তম গেমউইকের আগে ব্যবহার না করলে তা নষ্ট হয়ে যায়। অনেকে এগুলো জমিয়ে রাখতে পছন্দ করলেও, বিশ্বকাপের পর এই অনিশ্চিত মৌসুমে শুরুতেই চিপস ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। প্রথম বা দ্বিতীয় গেমউইকেই বেঞ্চ বুস্ট ব্যবহার করে এরপর দ্রুত ওয়াইল্ডকার্ড খেলা যেতে পারে। এছাড়া তৃতীয় গেমউইকে ম্যানচেস্টার সিটি বনাম কভেন্ট্রি অথবা চতুর্থ গেমউইকে চেলসি বনাম হালের মতো ম্যাচে ট্রিপল ক্যাপ্টেন বা ফ্রি হিট চিপ কাজে লাগানো যেতে পারে। পাশাপাশি বোনাস পয়েন্ট সিস্টেমে (BPS) কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা উইঙ্গার, অ্যাটাকিং ফুল-ব্যাক এবং গোলরক্ষকদের বাড়তি সুবিধা দেবে, তবে সেন্টার-ব্যাকদের পয়েন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা হ্রাস পাবে।
এবারের মৌসুমে আন্তর্জাতিক বিরতির নিয়মে বড় পরিবর্তন আসছে। প্রথমবারের মতো সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরের আন্তর্জাতিক বিরতিকে একত্রিত করা হচ্ছে। এর ফলে ২০ সেপ্টেম্বর রবিবার থেকে ১০ অক্টোবর শনিবার পর্যন্ত (গেমউইক ৫ এবং গেমউইক ৬-এর মাঝে) টানা তিন সপ্তাহ প্রিমিয়ার লিগের কোনো ম্যাচ থাকবে না। এই দীর্ঘ বিরতিতে জাতীয় দলগুলো সাধারণত দুটি ম্যাচের পরিবর্তে চারটি করে ম্যাচ খেলবে। বেশি ম্যাচ খেলার কারণে খেলোয়াড়দের ইনজুরিতে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই গেমউইক ৬-এর আগে ফ্রি ট্রান্সফার জমিয়ে রাখা অথবা একটি ওয়াইল্ডকার্ড ব্যবহার করা সুবিধাজনক হতে পারে। এরপর নভেম্বর মাসে গেমউইক ১০ ও ১১-এর মাঝে একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক বিরতি থাকবে।





























